ইউরোপে মার্কিন ঘাঁটি সংকোচনের ছক, বড় পরীক্ষায় ন্যাটো

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

ইউরোপে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (পেন্টাগন) ইউরোপে মোতায়েন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পুনর্বিন্যাসের একাধিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। কয়েক দিনের মধ্যে পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে এসব পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে পারেন।

  • সেনা-অস্ত্র সরানোর পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপে পুনর্মোতায়নের পরিকল্পনা
  • ৪০ হাজার সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা
  • সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ নিরাপত্তা সম্পর্কে

বড় আকারের প্রত্যাহারের সম্ভাবনা
বর্তমানে ইউরোপে প্রায় ৬৮ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। আলোচনায় থাকা একটি বিকল্পে এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। এতে জার্মানি, ইতালি ও স্পেনে থাকা মার্কিন সেনাদের ওপর তুলনামূলক বেশি প্রভাব পড়তে পারে।

আরও বড় পরিসরের একটি পরিকল্পনায় প্রায় ৪০ হাজার সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি সামরিক বিমান, যুদ্ধজাহাজ ও অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এগুলো এখনো সম্ভাব্য বিকল্প; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

অন্যদিকে, ইউরোপ থেকে পুরোপুরি সরে না গিয়ে পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের কিছু সেনাকে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে পুনর্মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে। ফলে সেনাসংখ্যা কমলেও পূর্ব ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়তে পারে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব
এই আলোচনা সামনে আসার সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইউরোপের কয়েকটি মিত্রদেশ মার্কিন বাহিনীকে তাদের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। স্পেন ও ইতালিসহ কয়েকটি দেশ ওয়াশিংটনের ইরাননীতি নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনাও করেছে।

এতে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে ন্যাটোর সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে দীর্ঘদিনের মার্কিন চাপও আলোচনায় রয়েছে।

জার্মানি ঘিরে বাড়ছে নজর
ইউরোপে সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাসে জার্মানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর একটি। ইউরোপে থাকা মার্কিন সেনাদের অর্ধেকের বেশি দেশটিতে অবস্থান করছে। এরই মধ্যে জার্মানি থেকে প্রায় পাঁচ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির খবর এসেছে।

গত বছর রোমানিয়া থেকেও প্রায় দুই হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হয়। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করার পর জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হোয়াইট হাউসকে অন্তত ২৫ হাজার সেনা একসঙ্গে প্রত্যাহার না করার বিষয়ে রাজি করেছিলেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

রাশিয়া ও ন্যাটোর সমীকরণ
ইউরোপ থেকে বড় পরিসরে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হলে ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামোয় তার প্রভাব পড়তে পারে। জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশ্লেষক ইয়ান লেসারের মতে, এতে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার জন্য কিছু কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে।

তবে প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে সেনারা কোথা থেকে এবং কীভাবে সরানো হচ্ছে তার ওপর। পশ্চিম ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় ন্যাটো সীমান্তে পাঠানো হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। কারণ জার্মানি ও ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকি
সেনা প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সামরিক সক্ষমতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। ইউরোপীয় ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে ওয়াশিংটন দ্রুত ইউরোপ ও আশপাশের অঞ্চলে সেনা, বিমান ও অন্যান্য সামরিক শক্তি মোতায়েন করতে পারে। উপস্থিতি কমলে সেই দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা সীমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ন্যাটোর সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়েও ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালের ন্যাটো সম্মেলনে সদস্যদেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ফলে আসন্ন সিদ্ধান্ত শুধু সেনা প্রত্যাহারের হিসাব নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপনীতি, ন্যাটোর দায়িত্ব বণ্টন এবং রাশিয়াকে ঘিরে জোটের প্রতিরোধ কৌশলে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিতে পারে।

এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন