গাজার ১৩ বছরের কিশোরীকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘থার্টিন ইন গাজা’,টরন্টোতে জিতেছে নেটপ্যাক পুরস্কার

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৪:২৮ অপরাহ্ণ

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় একটি শরণার্থীশিবিরে বেড়ে ওঠা ১৩ বছরের কিশোরীর জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘থার্টিন ইন গাজা’ জিতেছে ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (টিআইএফএফ) নেটপ্যাক পুরস্কার। ফিলিস্তিনি নির্মাতা হোসাম আবু দানের প্রথম কাহিনিচিত্র এটি।

১১ দিনব্যাপী টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের শেষ দিনে রোববার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম বা দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাজের মধ্য থেকে সেরা ছবিকে দেওয়া হয় নেটপ্যাক পুরস্কার।

গাজার বাস্তবতায় ১৩ বছরের রাঘাদ

‘থার্টিন ইন গাজা’ ছবির গল্প ১৩ বছরের রাঘাদকে ঘিরে। যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাবার সঙ্গে একটি শরণার্থীশিবিরে থাকা এই কিশোরী কৈশোরের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। একই সঙ্গে তাকে মোকাবিলা করতে হয় যুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা এবং ব্যক্তিগত পরিসর হারানোর বাস্তবতা।

৭৭ মিনিটের ছবিটি পুরোপুরি গাজায় স্থানীয় ফিলিস্তিনি কলাকুশলীদের নিয়ে নির্মিত হয়েছে। টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সেন্টারপিস বিভাগে ছবিটির বিশ্ব উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়।

ছবিটিকে পুরস্কৃত করার ব্যাখ্যায় নেটপ্যাক জুরি জানায়, গাজার চলমান পরিস্থিতিকে ছবিটি কেবল দুর্ভোগের প্রদর্শনী হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং যুদ্ধের মধ্যেও মানুষের জীবনের নানা জটিলতা ও ব্যক্তিগত অনুভূতিকে শক্তিশালী দৃশ্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

জুরি ছবিটিকে ‘সাহসী ও জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন কণ্ঠের আগমন ঘটেছে।

পুরস্কার পাওয়ার পর নির্মাতা হোসাম আবু দান বলেন, গাজার মানুষের কণ্ঠ আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে—এটি তাঁদের জন্য গভীর গর্বের বিষয়। গাজার অসংখ্য বেদনাদায়ক গল্পের মধ্য থেকে একটি মানুষের গল্প বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পেরেছেন বলেও জানান তিনি।

ভারতের ‘আং’ পেল প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার

এবারের টিআইএফএফে ভারতের জন্যও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। থেজা রিও পরিচালিত ‘আং’ জিতেছে প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার।

ভারত–মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাগাল্যান্ডের একটি গ্রামের শেষ জীবিত প্রধানকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে ছবিটি। চলচ্চিত্রটির বেশির ভাগ সংলাপ কোনিয়াক ভাষায়।

পুরস্কার পাওয়ার পর থেজা রিও বলেন, নিজের জন্মভূমি ও জনগোষ্ঠীর গল্প এবং তাঁদের কণ্ঠ তুলে ধরাই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। সেই চলচ্চিত্র নিয়ে টরন্টো এসে পুরস্কার পাওয়া তাঁর কাছে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো।

এবার প্ল্যাটফর্ম পুরস্কারের গুরুত্বও বেড়েছে। প্রথমবারের মতো এই পুরস্কারজয়ী অ-ইংরেজি ভাষার ছবি অস্কারের সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। তবে অস্কারের অন্যান্য যোগ্যতার শর্তও পূরণ করতে হবে।

দর্শকের পছন্দ ‘লা বোলা নেগ্রা’

টিআইএফএফের মূল পিপলস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে স্পেনের ছবি ‘লা বোলা নেগ্রা’। হাভিয়ের কালভো ও হাভিয়ের আমব্রোসি পরিচালিত ছবিটির গল্প বিস্তৃত ১৯৩২, ১৯৩৭ ও ২০১৭—এই তিন সময়কে ঘিরে।

স্পেনের তিন পুরুষের জীবন, ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ও যন্ত্রণার গল্পকে একই সূত্রে এনেছে চলচ্চিত্রটি। এর আগে কান চলচ্চিত্র উৎসবেও ছবিটি আলোচনায় আসে এবং সেখানে দুই নির্মাতা যৌথভাবে সেরা পরিচালকের পুরস্কার পান।

টরন্টো উৎসবের পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে দুই নির্মাতা উপস্থিত ছিলেন না। তাঁরা তখন স্পেনে ছবিটির প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন। তাঁদের পাঠানো বার্তা অনুষ্ঠানে পড়ে শোনানো হয়।

কানাডার সেরা ‘সানবার্ন’

সেরা কানাডীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে সারভিল পোবলেতের ‘সানবার্ন’। টরন্টোর ব্লিকার স্ট্রিট এলাকার একদল কিশোর-কিশোরীর বেড়ে ওঠার গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ছবিটি।

জুরির ভাষায়, ছবিটি প্রাণবন্ত, মজার এবং একই সঙ্গে মানবিক।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পিপলস চয়েজ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে সাইমন স্টোনের ‘এলসিনোর’। প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে দর্শকের পছন্দ হয়েছে ব্যারি অ্যাভরিচের ‘ডারলিন লাভ: আই নো হয়ার আ’ভ বিন’। মিডনাইট ম্যাডনেস বিভাগে দর্শকের পছন্দ হয়েছে ম্যাথিউ র‍্যানকিনের ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, ব্রায়ান মালরনি’।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের সংগঠন ফিপ্রেসির পুরস্কার পেয়েছে আইরিশ লেখক-নির্মাতা ডেভিড টারপিনের ‘অ্যানসেস্টরস’।

১১ দিনে ২৯৪টি চলচ্চিত্র

এবারের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ৭২টি দেশের মোট ২৯৪টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। ১১ দিনের উৎসবে ৯৮টি লালগালিচায় অংশ নিয়েছেন আট শতাধিক শিল্পী ও চলচ্চিত্রকর্মী।

এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ২৭৯ জন পরিচালক উৎসবে অংশ নেন। স্বীকৃত গণমাধ্যমকর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ হাজার। প্রথমবারের মতো চালু হওয়া ‘টিআইএফএফ: দ্য মার্কেট’-এ অংশ নেন প্রায় ৭ হাজার প্রতিনিধি।

১০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ১১ দিনের আয়োজন শেষ হয় রোববার। পুরস্কার ঘোষণার পাশাপাশি শেষ দিনেও দর্শকদের জন্য উৎসবের বিভিন্ন আয়োজন চালু ছিল। পিপলস চয়েজ পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্রগুলোর বিশেষ বিনা মূল্যের প্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হয়।

উৎসবের প্রধান নির্বাহী ক্যামেরন বেইলি শেষ দিনে দর্শক উপস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, টিআইএফএফের দর্শকভিত্তি আগের মতোই শক্তিশালী এবং এবারও বিপুলসংখ্যক দর্শক উৎসবে অংশ নিয়েছেন।

কালের  আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন