হাজিরা খাতায় এখনও আছে অপ্রতিমের নাম, নেই শুধু সে

কুমিল্লা সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৪:৪৮ অপরাহ্ণ

কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ‘ক’ শাখার শিক্ষার্থী এশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। হাজিরা খাতায় তার নাম এখনও রয়েছে, রোল নম্বর ২৯। তবে আর কোনোদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ডাকবেন না সেই রোল নম্বর। সহপাঠীদের কোলাহলের মাঝেও থাকবে না অপ্রতিমের পরিচিত মুখ। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের ১, ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিল অপ্রতিম। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সে স্কুলে এসেছিল। ওই দিন বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবলও খেলেছিল। এরপর শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে।

অপ্রতিমের নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সহপাঠীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশের লালমাই সানান্দা পাহাড় এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

রোববার বিদ্যালয় খোলার পর যথারীতি হাজিরা নেওয়া হয়। তখন হাজিরা খাতায় অপ্রতিমের নামের পাশে লেখা হয় অনুপস্থিত। কিন্তু সহপাঠীরা জানে, এই অনুপস্থিতি আর কোনোদিন কাটবে না।

অপ্রতিমের সহপাঠী মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার বিকেলে ফেসবুকে বন্ধুর নিখোঁজ হওয়ার খবর দেখে তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি। তার ভাষ্য, নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলেও তারা একসঙ্গে ফুটবল খেলেছেন। তখন বুঝতে পারেননি সেটিই হবে অপ্রতিমের সঙ্গে তাদের শেষ দেখা।

আরেক সহপাঠী মো. সিয়াম বলেন, অপ্রতিমকে শেষবারের মতো বিদায় দিতে এসে বুক কেঁপে উঠছে। এত দ্রুত তাকে বিদায় দিতে হবে, তা কখনও ভাবেননি। তার ভাষায়, ক্লাসে অপ্রতিমের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিন পূরণ হবে না।

অপ্রতিমের শ্রেণিশিক্ষক মহিবুল্লাহ জানান, বৃহস্পতিবারই সর্বশেষ বিদ্যালয়ে এসেছিল অপ্রতিম। শুক্রবার নিখোঁজ হওয়ার পর শিক্ষক ও সহপাঠীরা তার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে।

পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সুরতহালকারী এসআই সাইফুল ইসলাম। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে জানান তিনি।

এদিকে রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসানকে (১৭) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা রোববার রাতে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ ছাড়া সিয়াম নামে আরও একজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে। প্রিয় সহপাঠীকে হারিয়ে তাই শোকের ভারে নীরব তার স্কুলের শ্রেণিকক্ষ। হাজিরা খাতায় রোল নম্বর ২৯ থাকলেও সেই বেঞ্চে আর ফিরবে না অপ্রতিম।

কালের আলো/এমএসআইপি 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন