সন্তান প্রতিপালনে অতিরিক্ত কঠোরতা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অতিরিক্ত প্রশ্রয়ও শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা তৈরি করতে পারে। ইসলাম সন্তান লালন-পালনে ভালোবাসা, শাসন, ধৈর্য ও নৈতিক শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা এবং উত্তম উপদেশের মাধ্যমে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৫) পরিবারে সন্তানের ক্ষেত্রেও প্রজ্ঞা ও কোমলতার এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ আরও বলেন, ‘আল্লাহর দয়াতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছেন; যদি আপনি রূঢ়ভাষী ও কঠিন মনের হতেন, তবে তারা সবাই আপনার চারপাশ থেকে দূরে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
তবে সন্তানকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়াও ইসলামের শিক্ষা নয়। কোরআনে পরিবারকে নৈতিকভাবে সুরক্ষিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৬)
নবীজির আচরণে ছিল স্নেহ ও কোমলতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন। তিনি তাঁর দৌহিত্র হাসান (রা.)-কে ভালোবাসতেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করতেন। শিশুদের আদর না করা প্রসঙ্গে তিনি দয়া ও মমতার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন।
হাদিসে এসেছে, ‘যেকোনো বিষয়ের সঙ্গে যখন কোমলতা যুক্ত হয়, তখন তা সেই বিষয়কে সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ করে তোলে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৪)
হজরত আনাস (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, পরিবার ও শিশুদের প্রতি নবীজি (সা.)-এর মতো অধিক দয়ালু মানুষ তিনি দেখেননি।
বয়স অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়ার গুরুত্ব
সন্তানকে কোনো ভালো কাজে অভ্যস্ত করতে ধৈর্য ও ধারাবাহিকতার প্রয়োজন। নামাজের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের সাত বছর বয়স থেকে নির্দেশ দিতে এবং ধীরে ধীরে অভ্যাস করানোর কথা বলেছেন। এতে বোঝা যায়, গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা একদিনে চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ছোটবেলা থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে তোলা উচিত।
শারীরিক শাসনে সতর্কতা
সন্তানকে শাসনের ক্ষেত্রে রাগ বা প্রতিশোধের মনোভাব ইসলাম সমর্থন করে না। শাসনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সংশোধন। শিশুর মুখ বা সংবেদনশীল অঙ্গে আঘাত করা এবং এমনভাবে শাসন করা যাতে শরীরে ক্ষত বা দাগ সৃষ্টি হয়—এসব বিষয়ে ইসলামি শিক্ষায় কঠোর সতর্কতা রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজের আচরণও ছিল কোমলতার উদাহরণ। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবীজি (সা.) নিজের হাতে কোনো নারী বা সেবককে আঘাত করেননি।
গালমন্দ ও বদদোয়া নয়
শুধু শারীরিক আঘাত নয়, কটু কথা, অপমান, গালমন্দ কিংবা সন্তানের প্রতি বদদোয়াও শিশুর মনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিনকে কটুভাষী, অভিশাপকারী ও অশ্লীলভাষী হতে নিষেধ করেছেন।
সন্তানদের ওপর বদদোয়া করতেও নিষেধ করেছেন তিনি। তাই ভুল করলে অপমান না করে বোঝানো, সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং ভালো আচরণের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দেওয়াই ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সন্তান মা-বাবার জন্য একটি আমানত। তাকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধু কঠোর শাসন বা সীমাহীন প্রশ্রয় নয়—ভালোবাসা, ধৈর্য, নৈতিক শিক্ষা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং মা-বাবার নিজেদের উত্তম আচরণই গুরুত্বপূর্ণ।
কালের আলো/এসএ

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৮:২৪ অপরাহ্ণ