মিরপুর ডিএইচএসের একটি বাড়ির ঠিকানায় গিয়ে খোঁজ করা হলো বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ইসির নথিতে ঠিকানাটি স্পষ্ট। কিন্তু বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীর পরিবার জানাল, সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের অফিস নেই। থাকেন দলের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও তাঁর পরিবার। দলের কার্যালয়ের বদলে ভবনটি এখন কার্যত একটি আবাসিক ঠিকানা।
- রাজধানীতে ৮ নিবন্ধিত দলের কার্যালয়ের হদিস নেই; ৩টি তালাবদ্ধ
- মাঠপর্যায়ে ৩৬ দলের সংগঠনের হদিস নেই
- কেন্দ্র থেকে জেলা-উপজেলা—কার্যালয় ও কর্মীহীনতার চিত্র
মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় জাতীয় পার্টি-জেপির যে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকার কথা, সেখানেও নেই কোনো দলীয় তৎপরতা। দরজার ওপাশে রাজনৈতিক কর্মী নয়, থাকছেন ব্যাচেলর ভাড়াটেরা। পুরানা পল্টনের তোপখানা রোডে বাংলাদেশ সাম্যবাদী দলের নামে দেওয়া ঠিকানাতেও মিলল না দলের কোনো চিহ্ন। ভবন মালিকের ভাষ্য, দলটি প্রায় এক বছর আগেই চলে গেছে।
আরও এক ধাপ এগিয়ে পুরানা পল্টনের ইশরাত টাওয়ার। ইসির নথিতে এখানে গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকার কথা। বাস্তবে নেই অফিস, নেই দলীয় কার্যক্রমও। দলের সভাপতিই বলছেন, ‘আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি সেখানে নেই। দলের কার্যক্রমও নেই।’ অর্থাৎ ইসির কাগজে যে ঠিকানাগুলো এখনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় বহন করছে, সরেজমিনে তার অনেকগুলোর অস্তিত্বই মিলছে না।
কোথাও অফিস নেই, কোথাও অফিস থাকলেও মাসের পর মাস তালাবদ্ধ। আবার কোনো দলের কার্যালয় এখন ব্যক্তিগত বাসা, কোনোটি আইনজীবীর চেম্বার কিংবা অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক বাস্তবতা খুঁজতে গিয়ে এমনই এক অস্বস্তিকর চিত্র উঠে এসেছে।
৬০ দলের মধ্যে ঢাকাতেই ৮টির কার্যালয় নেই
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ৬০টি। এর মধ্যে রাজধানীতে ইসির দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে আটটি দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পাওয়া যায়নি। আরও তিনটি দলের কার্যালয় থাকলেও সেগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। কার্যক্রম স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগ এই হিসাবের বাইরে।
ইসিতে নিবন্ধিত ৪৮টি দলের কার্যালয় ঘুরে, ভবন কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধনের সময় দলগুলো যে সাংগঠনিক উপস্থিতির দাবি করেছিল, তার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার অনেক ক্ষেত্রে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
কাগজে কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বাস্তবে অন্য ঠিকানা
বিএনএফের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, তোপখানা রোডের শিশু কল্যাণ পরিষদে তাঁদের পুরোনো কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টের পর সেখানে আর যাওয়া হয়নি। বর্তমানে ডিওএইচএসের একটি ছোট জায়গা সভাপতির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রয়োজন হলে রেস্তোরাঁ বা কারও বাসায় বৈঠক করতে হয়।
বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের মিরপুরের ঠিকানায় গিয়ে কোনো কার্যালয় পাওয়া যায়নি। দলটির প্রধান আবু লায়েস মুন্না জানিয়েছেন, অফিস এখন বন্ধ এবং পল্টন এলাকায় নতুন কার্যালয় খোঁজা হচ্ছে।
ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের গুলশানের ঠিকানাতেও নেই দলটির কার্যালয়। মহাসচিব শেখ রায়হান রাহবার জানিয়েছেন, মার্চের পর তাঁরা ওই অফিস ছেড়েছেন; এখনো নতুন জায়গা পাননি।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির পুরানা পল্টনের অফিসও নেই। দলের সংশ্লিষ্ট নেতার ভাষ্য, পুরোনো কার্যালয় ছেড়ে বায়তুল মোকাররমের আশপাশে নতুন অফিস নেওয়া হয়েছে। তবে সেই কার্যালয়ের সুনির্দিষ্ট ঠিকানাও তিনি জানাতে পারেননি।
কোথাও সাইনবোর্ড আছে, ভেতরে নীরবতা
তৃণমূল বিএনপির ক্ষেত্রে আবার ইসির ঠিকানায় দলীয় সাইনবোর্ড রয়েছে। তোপখানা রোডের মেহেরবা প্লাজার ১৬ তলায় কার্যালয় থাকলেও সেটি তালাবদ্ধ। ভবনের কর্মচারী জানান, নিয়মিত রাজনৈতিক কার্যক্রম সেখানে হয় না; জায়গাটি মূলত ‘দ্য চ্যানচেরি চেম্বারস’ ল ফার্মের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ধানমণ্ডির বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের কার্যালয়ের অবস্থাও প্রায় একই। ভবনের নিরাপত্তাকর্মীর দাবি, তিন মাসে মাত্র দুদিন কয়েকজনকে সেখানে দেখা গেছে। বাকি সময় কার্যালয় বন্ধ থাকে।
ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কার্যালয় রয়েছে, কিন্তু সেটিও নিয়মিত খোলে না। নিরাপত্তাকর্মীর ভাষ্য, ৫ আগস্টের আগে সেখানে একজন নিয়মিত থাকতেন; এরপর বিচ্ছিন্নভাবে এক-দুজন এলেও কার্যালয় প্রায় সবসময় বন্ধ।
মোহাম্মদপুরে বিএনএমের নামে একটি কক্ষ থাকলেও সাইনবোর্ড নেই। ভবনের নিরাপত্তাকর্মী জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর দলটির কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। দলটির চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ আবু জাফরও বলেছেন, এখন আর দলের কার্যক্রম নেই এবং কার্যালয়ও বন্ধ থাকে।
ঢাকার বাইরে চিত্র আরও ফ্যাকাশে
রাজধানীর বাইরের বাস্তবতা আরও দুর্বল। নিবন্ধনের সময় অন্তত ২১টি জেলা এবং ১০০টি উপজেলা বা থানায় দলীয় কার্যালয়ের তথ্য দিয়েছিল বিভিন্ন দল। কিন্তু সরেজমিনে এসব কার্যালয়ের বড় একটি অংশের অস্তিত্ব বা নিয়মিত কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
নড়াইলে জাতীয় পার্টি, সিপিবি, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, এনসিপি, বাসদ, এনপিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কার্যালয়ের সাইনবোর্ড রয়েছে। তবে বেশির ভাগ কার্যালয় বছরের পর বছর তালাবদ্ধ।
নিয়মিত কার্যক্রমের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে দেখা যায় বিএনপি, জামায়াত, গণঅধিকার ও এনসিপির। ঝালকাঠিতেও কয়েকটি নিবন্ধিত দলের কার্যালয় রয়েছে। তবে সব দলের সাংগঠনিক তৎপরতা সমান নয়।
নিবন্ধনের শর্ত কি শুধু কাগজেই?
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের সঙ্গে সাংগঠনিক উপস্থিতির বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। অথচ নিবন্ধনের পর সেই কাঠামো বাস্তবে কতটা টিকে আছে, তা নিয়মিত যাচাইয়ের প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, কার্যালয় ও কার্যক্রমহীন দলকে এভাবে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং এ ক্ষেত্রে ইসির নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।
নামের সঙ্গে সংগঠনও কি আছে?
নিবন্ধিত ৬০টি দলের সবাই যে একই অবস্থায় রয়েছে, তা নয়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এনসিপিসহ কয়েকটি দলের নিয়মিত রাজনৈতিক তৎপরতা দৃশ্যমান। আবার অনেক দলের কার্যক্রম সীমিত, কোনো কোনো দলের ক্ষেত্রে তা প্রায় অদৃশ্য।
তবে প্রশ্নটি থেকেই যায়—নিবন্ধনের সময় যে সাংগঠনিক কাঠামো দেখিয়ে একটি দল রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেল, কয়েক বছর পর সেই কাঠামোর অস্তিত্ব কোথায়? কেন্দ্রীয় কার্যালয় নেই, জেলা-উপজেলায় সংগঠন নেই, নিয়মিত রাজনৈতিক কার্যক্রমও নেই—তবু নিবন্ধন বহাল থাকছে কোন বাস্তবতার ভিত্তিতে?
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কেবল একটি নাম, প্রতীক ও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রশ্ন। তাই ইসির নথিতে থাকা ঠিকানার সঙ্গে মাঠের বাস্তবতা মিলিয়ে দেখা এখন আর নিছক প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও যুক্ত।
কালের আলো/টিইকে/এমকে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৩:২৯ অপরাহ্ণ