আল-খাদার স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠেছিল। গ্যালারিতে তরুণদের গান, পরিবারের সদস্যদের আসন নেওয়া, সামনের সারিতে শিশুদের ছোটাছুটি—কয়েক ঘণ্টার জন্য দৃশ্যটা যেন যুদ্ধের বাস্তবতা ভুলিয়ে দিয়েছিল সবাইকে।
মাঠে নেমেছিল আরব অর্থোডক্স বেইত জালা ও দেইশেহ ইয়ুথ ফুটবল দল। বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ। গ্যালারি থেকে ভেসে আসে উল্লাস, হতাশা আর রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে চিৎকার।
প্রায় তিন বছর পর ফিলিস্তিনি ক্লাবগুলোর প্রথম সংগঠিত প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ ছিল এটি।
বিরতিতে আতঙ্ক
ম্যাচের বিরতিতে হঠাৎ স্টেডিয়ামের পেছনে গোলমালের সৃষ্টি হলে দর্শকেরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। মাঠ থেকেই পরিস্থিতি দেখছিলেন বেইত জালার ২০ বছর বয়সী খেলোয়াড় সিজার সাররাস।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমি ভয় পেয়েছিলাম যখন দেখলাম সব দর্শক উঠে দাঁড়াচ্ছে।’
ফিলিস্তিনে সংঘাতের কারণে এমন পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত সাররাস। তিনি বলেন, কখনো কখনো মাঠে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার খবর শোনেন। তাই প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এসেছে।
কিন্তু এবার সেটি সামরিক অভিযান ছিল না। সমর্থকদের মধ্যকার একটি ঝগড়া থেকেই উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি শান্ত হলে দর্শকেরা আবার আসনে ফিরে যান, শুরু হয় ম্যাচ।
এরপর পুরো মনোযোগ আবার ফুটবলে।
‘স্বাভাবিক জীবনের অনুভূতি’
১৫ বছর বয়সী রিমাস সারহানের কাছে এই ম্যাচের তাৎপর্য ছিল আরও গভীর। বেথলেহেমের আইদা শরণার্থী শিবিরের এই কিশোরী আওদ স্পোর্টস একাডেমি ও ফিলিস্তিনের যুব জাতীয় দলের হয়ে খেলেন।
পূর্ণ গ্যালারির সামনে খেলার অনুভূতিকে তিনি বলেছেন ‘খুব সুন্দর’।
সারহানের ভাষায়, ‘এটি আমাদের অনুভব করায় যে, আমাদের জীবনেও একটু স্বাভাবিকতা আছে। বিদেশের মানুষের মতো।’
নিহত ক্রীড়াবিদদের স্মরণে টুর্নামেন্ট
এই ম্যাচ ছিল ‘থাউজ্যান্ড মার্টার্স কাপ’-এর অংশ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে নিহত ১ হাজার ১৪ জন ক্রীড়াবিদকে স্মরণ করে টুর্নামেন্টটির নামকরণ করা হয়েছে।
গাজায় যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীরে বাড়তে থাকা হামলার কারণে দীর্ঘ সময় প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল বন্ধ থাকার পর আবার মাঠে ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই আয়োজন করা হয়েছে এই টুর্নামেন্ট।
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) সাধারণ সম্পাদক ফিরাস আবু হিলালের অভিযোগ, ইসরায়েলি দখলদারিত্বের কারণে দীর্ঘদিন ফুটবল কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
চেকপোস্ট, চলাচলে বিধিনিষেধ, ক্রীড়া স্থাপনায় হামলা এবং খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের কারণে ফুটবল আয়োজন কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে দাবি তাঁর।
‘গাজায় প্রায় ৯০ শতাংশ স্টেডিয়াম ধ্বংস’
আবু হিলালের দাবি, গাজায় প্রায় ৯০ শতাংশ স্টেডিয়াম ধ্বংস হয়ে গেছে। কিছু মাঠে এখন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর তাঁবু রয়েছে।
এই দীর্ঘ বিরতির প্রভাব পড়েছে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারেও। সাররাস বলেন, ‘আমরা এমন একটি সময়ে বড় হয়েছি, যখন আমাদের উন্নতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হয়ে গেছে। সময়টা আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। কোনো লিগ ছিল না।’
তবু এখন ধীরে ধীরে মাঠে ফিরেছে ২০০-এর বেশি ক্লাব। পশ্চিম তীর, গাজা এবং লেবাননের ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরগুলোতে আবার শুরু হয়েছে ফুটবল কার্যক্রম।
প্রত্যাবর্তনের পেছনে অসংখ্য হারানোর গল্প
এই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ক্রীড়াবিদের হারানোর গল্প। যুদ্ধের সময় নিহত হয়েছেন অনেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক।
তাদের মধ্যে রয়েছেন ফিলিস্তিন জাতীয় দলের সাবেক ফরোয়ার্ড সুলাইমান আল-ওবেইদ। ২০২৫ সালে গাজায় ত্রাণের অপেক্ষায় থাকার সময় তিনি নিহত হন। ২০২৪ সালে নিহত হন ফিলিস্তিন অলিম্পিক দলের কোচ হানি আল-মাসদার।
আবু হিলাল বলেন, ‘আমরা ফিরে এসেছি পুরো বিশ্বকে দেখানোর জন্য যে, আমরা এমন একটি জাতি, যাদের বেঁচে থাকতে হবে।’
ম্যাচের চেয়েও বড় বাধা
মাঠে ফিরলেও খেলোয়াড়দের জন্য পরিস্থিতি আগের মতো সহজ হয়নি। পশ্চিম তীরে দূরপাল্লার যাতায়াত কমাতে কাছাকাছি এলাকার দলগুলোকে একই গ্রুপে রেখেছে পিএফএ। তারপরও ম্যাচে পৌঁছানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
আবু হিলালের ভাষায়, ‘প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি শহরের প্রবেশপথে একটি করে লোহার সামরিক গেট আছে। দখলদার বাহিনী যেকোনো সময় এসে সেই গেট বন্ধ করে দিতে পারে, তখন দল ম্যাচে পৌঁছাতে পারে না।’
তবে এসব কারণে টুর্নামেন্ট বন্ধ হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
‘ম্যাচ পিছিয়ে যেতে পারে, কিন্তু বাতিল হবে না। ম্যাচ হতেই হবে, আমাদের খেলতেই হবে।’
অর্থ সংকটেও থামেনি ফুটবল
প্রায় তিন বছর প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল বন্ধ থাকায় আর্থিক সংকটও তৈরি হয়েছে। অনেক ক্লাব খেলোয়াড়দের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য হারিয়েছে। ফলে পেশাদার ফুটবলারদের কেউ কেউ আবার অপেশাদার পর্যায়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
দেইশেহের খেলোয়াড় ও স্থানীয় ফুটবল একাডেমির কোচ মোহাম্মদ এল-জগাইরি বলেন, ‘কিছু মানুষের ক্রীড়া ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে।’
নিজের ক্যারিয়ারও নানা বাধায় থেমে গিয়েছিল তাঁর। ইসরায়েলি কারাগারে তাঁকে বিভিন্ন সময়ে মোট আট বছর ছয় মাস কাটাতে হয়েছিল। ২০১৫ সালে সেনাদের গুলিতে তাঁর পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ায় দুই বছর মাঠের বাইরে ছিলেন।
তবে পরে আবার অনুশীলনে ফেরেন তিনি।
‘আত্মসমর্পণের কোনো জায়গা নেই। আমরা প্রতিরোধ করতে চাই, আমরা বাঁচতে চাই এবং আমরা আশাকে আঁকড়ে ধরতে চাই,’ বলেন এল-জগাইরি।
ধ্বংসের হুমকির মধ্যেও মাঠে মেয়েরা
গত তিন বছরে হামলার শিকার হওয়া অনেক মাঠেই এখন আবার ফুটবল চলছে। পিএফএর দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ২৬৫টি ক্রীড়া স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
পশ্চিম তীরেও ঝুঁকি কমেনি। বেথলেহেমের আইদা শরণার্থী শিবিরে আওদ স্পোর্টস একাডেমির মাঠটি ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতাবাদী দেয়াল ও নজরদারি টাওয়ারের ছায়ায় অবস্থিত। স্থানীয়দের ভাষ্য, শিবিরটিতে নিয়মিত সামরিক অভিযানও হয়।
থাউজ্যান্ড মার্টার্স কাপে খেলার প্রস্তুতি নেওয়া ২০ বছর বয়সী কারিম বলেন, এসব পরিস্থিতি খেলোয়াড়দের মানসিকতায় প্রভাব ফেলে। নিরাপত্তার কারণে নিজের আসল নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি।
২০২৫ সালের শেষ দিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ মাঠটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল বলেও জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিবাদের পর ফিফা ও উয়েফাসহ বিভিন্ন ফুটবল সংস্থার উদ্যোগে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়। তবে মাঠটির ওপর হুমকি পুরোপুরি শেষ হয়েছে—এমন আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা এখনো পায়নি আইদা ইয়ুথ সেন্টার।
কারিম বলেন, ‘এই মাঠ আমাদের জন্য শ্বাস নেওয়ার জায়গা। যখন ধ্বংসের নির্দেশ এসেছিল, আমরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।’
ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরে শিশুদের খেলাধুলার জন্য মাঠটি অন্যতম কয়েকটি খোলা জায়গা। একই সঙ্গে মেয়েদের জন্যও এটি তৈরি করেছে নতুন সুযোগ।
১৫ বছর বয়সী ফাতিমা লুৎফি বলেন, ‘আমি সেই নিয়ম ভেঙেছি যে ফুটবল মেয়েদের জন্য নয়।’
‘আমরা শুধু একটি সংখ্যা নই’
সব বাধা সত্ত্বেও ‘থাউজ্যান্ড মার্টার্স কাপ’ নিয়মিত আয়োজনের কথা জানিয়েছে পিএফএ।
আল-খাদার স্টেডিয়াম থেকে সাররাস বলেন, ‘কিছু মানুষের জীবন নির্ভর করে তাদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার ওপর। কারণ সেটাই তাদের আশা দেয়।’
এরপর তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে এই প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় বার্তা—
‘আমাদের হয়তো অনেক কিছু নেই। কিন্তু আমরা আছি। আমরা শুধু একটি সংখ্যা নই।’
কালের আলো/এসএ

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৫:১৮ অপরাহ্ণ