চীন-পাকিস্তান সীমান্ত কমিশন, কাশ্মীর নিয়ে ভারতের তীব্র আপত্তি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৬:০০ অপরাহ্ণ

হিমালয়ের বিতর্কিত একটি অঞ্চল ঘিরে নতুন করে মুখোমুখি অবস্থানে ভারত, পাকিস্তান ও চীন। পাকিস্তান ও চীন যৌথ সীমান্ত কমিশন গঠনের বিষয়ে চুক্তি করেছে। দুই দেশের ভাষ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও যোগাযোগে সহযোগিতা বাড়াতেই এ উদ্যোগ।

তবে বিতর্কিত শাকসগাম উপত্যকাসহ সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডকে নিজেদের অংশ দাবি করে এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। নয়াদিল্লির বক্তব্য, পাকিস্তান ওই ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ধরনের চুক্তি করার আইনগত অধিকার রাখে না।

‘পাকিস্তান-চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছেন, ‘পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। আমরা তথাকথিত যৌথ কমিশন প্রত্যাখ্যান করছি। এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’

ভারতের দাবি, পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং চীনের সঙ্গে সীমান্তবর্তী ওই ভূখণ্ড ভারতের। ফলে সেখানে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত চূড়ান্ত করার উদ্যোগ ভারতের সার্বভৌমত্বের দাবিতে কোনো পরিবর্তন আনবে না।

এদিকে পাকিস্তানের অবস্থান ভিন্ন। ইসলামাবাদ বলছে, জম্মু ও কাশ্মীর এখনো একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড। ফলে ১৯৬৩ সালে চীনের সঙ্গে করা সীমান্ত চুক্তির বৈধতা নিয়ে ভারতের আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

শাকসগাম উপত্যকা কেন গুরুত্বপূর্ণ

নতুন যৌথ কমিশনের আওতাভুক্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে শাকসগাম উপত্যকা। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চল চীনের কাছে হস্তান্তর করে।

ভারত ওই চুক্তিকে কখনো স্বীকৃতি দেয়নি। নয়াদিল্লির দাবি, শাকসগাম উপত্যকা তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ ছিল এবং পাকিস্তান সেটি দখলে নেওয়ার পর চীনের কাছে হস্তান্তর করে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের ভাষায় ‘অবৈধভাবে ও জোর করে দখল করে রাখা’ ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে কোনো চুক্তি করার আইনগত এখতিয়ার পাকিস্তানের নেই।

পুরোনো ব্যবস্থাই কি নতুন করে সক্রিয়?

দিল্লির শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জ্যাকবের মতে, যৌথ সীমান্ত কমিশনের ধারণাটি পুরোপুরি নতুন নয়। ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিতেই এমন কমিশনের কথা বলা হয়েছিল।

তবে এখন কেন সেটিকে সক্রিয় করা হলো, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, চীনের সীমান্তগুলোকে আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা এবং সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ ও চলাচল ব্যবস্থাকে কাঠামোবদ্ধ করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হতে পারে এটি।

জ্যাকবের মতে, ভারতের জন্য বিষয়টি উদ্বেগের হলেও এর অর্থ এই নয় যে লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক পরিবর্তন ঘটছে।

চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের কৌশলগত দিক

যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি মনে করেন, নতুন কমিশনটি একই সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত সহযোগিতা বাড়ানো, অবৈধ সীমান্ত পারাপার ঠেকানো এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপিইসি-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয় এতে রয়েছে।

হাক্কানির মতে, এর মাধ্যমে ভারতের প্রতিও একটি কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে—কাশ্মীর ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারত্বের পাশাপাশি সিপিইসি চীনের বৃহত্তর বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সহযোগিতা আরও কাঠামোবদ্ধ হতে পারে।

ভারত-চীন সম্পর্কেও চলছে সমীকরণ

চীন-পাকিস্তান উদ্যোগটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারত ও চীন নিজেদের সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। আগস্টে বেইজিংয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর দুই দেশ সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং একটি ‘ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য’ সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল।

তবে ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ এখনো অমীমাংসিত। দুই দেশের মধ্যে হিমালয়জুড়ে দীর্ঘ ও বিতর্কিত সীমান্ত রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান-চীন সীমান্ত কমিশনের উদ্যোগকে শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। তাদের মতে, এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণও প্রতিফলিত হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন উদ্যোগের তাৎক্ষণিক সামরিক প্রভাবের চেয়ে এর কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বই বেশি। ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও পাকিস্তান ও চীন সীমান্ত সহযোগিতাকে কীভাবে এগিয়ে নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন