জাতিসংঘে কূটনীতির কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের স্বার্থের খোঁজে ব্যস্ত সময়

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৮:২৯ অপরাহ্ণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে নিউইয়র্কে এখন বাংলাদেশের কূটনীতির ব্যস্ত সময়। বিশ্বনেতা থেকে জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা—এক বৈঠক শেষ না হতেই আরেক বৈঠক। আলোচনার টেবিলে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। এর মধ্যেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

  • রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ঘিরে ধারাবাহিক বৈঠক
  • এরদোয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার বার্তা
  • আগামীকাল জাতিসংঘে ভাষণ

জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপের কাছে চেয়েছেন রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সব মিলিয়ে এবারের নিউইয়র্ক সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলো সামনে আনছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে সফরের কেন্দ্রবিন্দু এখন আগামীকাল ২৪ সেপ্টেম্বরের সাধারণ পরিষদের মঞ্চ—যেখানে ১৫ মিনিটের ভাষণে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন তিনি।

এক দিনে একের পর এক বৈঠক
২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত প্রাতঃরাশ সভায় যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি শুরু হয়। পরে সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে অংশ নেন তিনি। দিন গড়ানোর সঙ্গে বাড়ে বৈঠকের ব্যস্ততা। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের ভাইস-প্রেসিডেন্ট উজ হুসেইন মোহাম্মদ লতিফ, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ের ফিল্স-এমের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তারেক রহমান।

একই দিনে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক এবং মেটার চিফ গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার জোয়েল কাপলানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন তিনি।

এরদোয়ানের সঙ্গে অর্থনীতি-রাজনীতির সমীকরণ
দিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোর একটি ছিল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ। নিউইয়র্কের তুর্কি হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়। অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন দুই নেতা। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অভিন্ন স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির প্রত্যয়ও আসে দুই শীর্ষ নেতার আলোচনায়।

রোহিঙ্গা সংকটে ঢাকার নতুন তাগিদ
নিউইয়র্কের আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটকে সামনে রেখেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দাবি তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপের সঙ্গে বৈঠকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা চান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে অংশ নেওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির সঙ্গে টেকসই সমাধানের বিষয়টি থাকবে ওই আলোচনার কেন্দ্রে।

জলবায়ু ও মানবিক সহযোগিতায়ও সক্রিয়তা
রোহিঙ্গা ইস্যুর পাশাপাশি ২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাচ্ছে মানবিক সহায়তা ও জলবায়ু। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আন্তর্জাতিক জনহিতকর ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার।

গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে।

পরে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং ন্যায়সংগত রূপান্তর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সেখানে তুলে ধরার সুযোগ থাকছে।

জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী
সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব আগামীকাল। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সূচি অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সাধারণ পরিষদ হলে বক্তব্য দেওয়ার কথা তার। বিকেলের অধিবেশনে ১৮ জন বক্তার মধ্যে ১১তম বক্তা হিসেবে তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১৫ মিনিট। এর আগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রারম্ভিক বক্তব্য দেবেন তিনি। একই দিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচিও রয়েছে।

শেষ দিনে অর্থনৈতিক কূটনীতির পালা
২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ছাড়ার আগে অর্থনৈতিক অঙ্গনেও ব্যস্ত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। ম্যানহাটনে জেপি মরগানের সদর দপ্তরে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার। একই দিনে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। রাত ১১টায় দুবাই হয়ে এমিরেটসের ইকে২০২ ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ছাড়ার কথা তার।

বার্তা একাধিক, মঞ্চ একটাই
নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মসূচির পরতে পরতে উঠে এসেছে বাংলাদেশের একাধিক অগ্রাধিকার—রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব। তবে সব কূটনৈতিক তৎপরতার পর সাধারণ পরিষদের ভাষণই হবে সফরের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুহূর্ত। বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলো কীভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী, এখন সেই দিকেই আন্তর্জাতিক মহলের নজর।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন