সন্ধ্যা নামার পর রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতেই যেন বদলে যায় অপরাধের মানচিত্র। আলো-আঁধারির সুযোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়, নির্জন সড়ক কিংবা ব্যস্ত এলাকার আশপাশে ওত পেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। সুযোগ পেলেই মোটরসাইকেল কিংবা প্রাইভেট কারে এসে পথচারীকে টার্গেট করে মুহূর্তেই কেড়ে নেয় মোবাইল ফোন, টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী। বাধা এলেই ব্যবহার করছে চাপাতি, ছুরি, ক্ষুর, ব্লেড কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র। সামান্য একটি ছিনতাই তাই পরিণত হচ্ছে প্রাণঘাতী হামলায়।
- সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্কের ছায়ায় ছিনতাইকারীদের দাপট
- মোবাইল-টাকার সঙ্গে যাচ্ছে প্রাণও
- সাত মাসে সারা দেশে ছিনতাই-দস্যুতা ও ডাকাতির ১ হাজার ২৮৬ মামলা
সংখ্যায়ও স্পষ্ট উদ্বেগ
পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে সারা দেশে ছিনতাই বা দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনায় ১ হাজার ২৮৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ছিনতাই বা দস্যুতার মামলা ১ হাজার ৬৮টি এবং ডাকাতির মামলা ৩১৮টি।রাজধানীর চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। ডিএমপি সদর দপ্তরের হিসাবে, একই সময়ে ঢাকার বিভিন্ন থানায় ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ২০০টি। এর মধ্যে ডাকাতির মামলা ২২টি এবং ছিনতাই বা দস্যুতার মামলা ১৭৮টি। দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানেও ছিনতাইয়ের ধারাবাহিক উপস্থিতি দেখা যায়। ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত তিন বছর সাত মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাই ও দস্যুতার অভিযোগে ১ হাজার ৭৪৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৫২৩টি মামলা হয়ে সংখ্যাটি সর্বোচ্চ ছিল। ২০২৪ সালে মামলা হয় ৩৯৫টি।
রাজধানীতে সহস্রাধিক সক্রিয়
পুলিশের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আটটি ক্রাইম জোনেই সক্রিয় ছিনতাইকারীর উপস্থিতি রয়েছে। মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে পাঁচ শতাধিক, মতিঝিল ও ওয়ারী বিভাগে ৩১৩ জন, রমনা ও লালবাগ বিভাগে ২৮৭ জন এবং উত্তরা ও গুলশান বিভাগে ৪৭৩ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে এক হাজারের বেশি ছিনতাইকারী সক্রিয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এদের বড় একটি অংশ মাদকাসক্ত। মাদকের অর্থ জোগাড়, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা—সব মিলিয়ে ছিনতাইয়ের ধরনও হয়ে উঠছে আগের চেয়ে বেশি সহিংস।
ছিনতাই থেকে হত্যাকাণ্ড
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। গত ২৯ আগস্ট ভোরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা-সংলগ্ন এলাকায় রিকশায় থাকা শিক্ষিকা রনজিলা পারভিনকে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা হ্যাঁচকা টান দিলে তিনি রিকশা থেকে পড়ে নিহত হন। একই দিন পুরান ঢাকার কদমতলীতে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন জনি (৩৫)। ৯ সেপ্টেম্বর পল্লবীর এ ব্লক এলাকায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন সজীব নামে এক ব্যক্তি। এর আগে ২৬ জুলাই মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারে ছিনতাইকারীদের হামলায় প্রাণ হারান ফজলে রাব্বি নামের এক যুবক। অর্থাৎ ছিনতাই এখন আর কেবল অর্থ বা মালামাল হারানোর ঘটনা নয়; প্রতিরোধ কিংবা সামান্য বাধাও অনেক ক্ষেত্রে ডেকে আনছে প্রাণঘাতী পরিণতি।
বড় অঙ্কের টাকাও নিরাপদ নয়
ছিনতাইকারীদের লক্ষ্য শুধু পথচারী নয়, বড় অঙ্কের অর্থ বহনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও। সম্প্রতি উত্তরা বিমানবন্দর সড়কের ক্রাউন প্লাজার সামনে ডিএল পেট্রল পাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা লুট করে দুর্বৃত্তরা। পালানোর সময় পাম্পের সহকারী ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আল আমিনকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়।মতিঝিলেও এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে গুলি করে বৈদেশিক মুদ্রাসহ ১৭ হাজার ডলার ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত ১ মে রাতে মালিবাগ রেলগেটের ইবনে সিনা হাসপাতালের সামনে তিন পোশাকশ্রমিক—করিমন, নবী ও রিফাত—ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন।
বাড়ছে টহল, কাটছে না আতঙ্ক
ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ডিএমপি। আটটি ক্রাইম জোনের ওসিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন ডিএমপি কমিশনার। অপরাধপ্রবণ এলাকায় টহল বাড়ানোর পাশাপাশি সিটিটিসি, ডিবি ও ক্রাইম বিভাগের সমন্বয়ে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি ও অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছেন তিনি।
ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলামও বলেছেন, ডাকাতি-ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা পুলিশ তৎপর রয়েছে।তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, অভিযান ও টহলের পাশাপাশি ছিনতাইকারীদের পুনরায় অপরাধে ফিরে আসা ঠেকানোও বড় চ্যালেঞ্জ। মাদক, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ—এসব কারণ চিহ্নিত করে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা না নিলে শুধু অভিযান দিয়ে পরিস্থিতি কতটা বদলানো যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রাজধানীবাসীর কাছে তাই সন্ধ্যার পরের শহর ক্রমেই হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তার জায়গা। রাস্তা ব্যস্ত থাকলেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা মিলছে না—আর সেই ফাঁকেই ছিনতাইকারীরা খুঁজে নিচ্ছে তাদের পরবর্তী ‘শিকার’।
কালের আলো/এসআর/এএএন

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১:৩৬ অপরাহ্ণ