মুঠোফোনে ব্যাংকিং, কঠিন সমীকরণ সামনে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ

ব্যাংকের ঠিকানা বদলাচ্ছে। ইট-পাথরের শাখা নয়, গ্রাহকের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনই হতে যাচ্ছে নতুন ব্যাংকিংয়ের প্রধান দরজা। সেই পরিবর্তনের পথে আরেক ধাপ এগোল বাংলাদেশ। পাঁচটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংককে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

  • এলওআইয়ের পর ৩০০ কোটি টাকার মূলধন, শাখা-উপশাখা ছাড়াই সেবা দেওয়ার প্রস্তুতি
  • বিকাশ, রবি, ভিওন-স্কয়ারসহ শক্তিশালী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে ব্যাংকিংয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র
  • আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি সাইবার ঝুঁকি ও তথ্য সুরক্ষাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ

কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক, ডিকে ডিজিটাল ব্যাংক, বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক ও নোভা ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য এটি বড় অগ্রগতি। তবে এলওআই মানেই ব্যাংক চালুর ছাড়পত্র নয়। বরং এখন শুরু হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব—মূলধন, প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের শর্ত পূরণ করে চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার লড়াই।

৫২ আবেদন থেকে পাঁচে
ডিজিটাল ব্যাংকের স্বপ্নের শুরু ২০২৩ সালে। প্রথম দফায় ৫২টি প্রতিষ্ঠান ও জোট লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে। যাচাই-বাছাই শেষে কড়ি ও নগদ ডিজিটাল ব্যাংককে এলওআই দেওয়া হয়েছিল। পরে শর্ত পূরণে জটিলতার কারণে কড়ির অনুমোদন স্থগিত হয়। নতুন শর্তে সেটি আবার এলওআইয়ের পর্যায়ে ফিরেছে। অন্যদিকে নগদ ডিজিটাল ব্যাংক চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

পরবর্তীতে নীতিমালায় পরিবর্তন এনে ২০২৫ সালে নতুন করে আবেদন আহ্বান করা হয়। এবার আবেদন পড়ে ১২টি। মোবাইল আর্থিক সেবা, টেলিযোগাযোগ ও শিল্প খাতের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতাটিও হয়ে ওঠে ভিন্ন মাত্রার। সেখান থেকেই বাছাই হয়ে পাঁচটি উদ্যোগ পেল এলওআই।

ব্যাংকিংয়ে ঢুকছে বড় প্রযুক্তি-গ্রাহকভিত্তি
নতুন উদ্যোগগুলোর উদ্যোক্তা কাঠামোই বলে দিচ্ছে, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বাজারে প্রতিযোগিতা শুধু ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ডিকে ডিজিটাল ব্যাংকের সঙ্গে রয়েছে ভুটানের ডিকে ব্যাংকের সম্পৃক্ততা। বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকের পেছনে রয়েছে দেশের বড় মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা বিকাশ। বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংকের সঙ্গে রয়েছে রবি আজিয়াটা।

নোভা ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা কাঠামোয় রয়েছে ভিওন ও স্কয়ার গ্রুপ। আর কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা হিসেবে রয়েছে হাবিবুল্লাহ এন করিমের নাম। অর্থাৎ একদিকে ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে বিপুল গ্রাহকভিত্তি, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা—সব মিলিয়ে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে একটি নতুন ব্যবসায়িক মডেল দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

৩০০ কোটি টাকা: প্রথম দরজার চাবি
এই বাজারে ঢুকতে অবশ্য শুধু বড় ব্র্যান্ড যথেষ্ট নয়। সংশোধিত নীতিমালায় ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। আগের সীমা ছিল ১২৫ কোটি টাকা। মূলধনের এই বড় ব্যবধান দেখাচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিটাল ব্যাংককে কেবল প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ হিসেবে দেখতে চাইছে না; বরং পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং ঝুঁকি বহনের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে চাইছে। উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ হওয়ার শর্তও তাই গুরুত্বপূর্ণ।

শাখা নেই, সেবা থাকবে স্ক্রিনে
ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে গ্রাহকের অভিজ্ঞতায়। অ্যাকাউন্ট খোলা, টাকা স্থানান্তর, আমানত, ঋণ কিংবা বিল পরিশোধ—এসব সেবা শাখা, উপশাখা বা কাউন্টারের পরিবর্তে মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কেন্দ্রীভূত হবে।

ফলে শাখা স্থাপন ও পরিচালনার প্রচলিত ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহক বা ব্যাংকের শাখায় যাওয়া যাদের জন্য ব্যয়বহুল, তাদের কাছেও দ্রুত সেবা পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।

বদল আসবে ঋণের বাজারে
ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা শুধু টাকা পাঠানো বা অ্যাকাউন্ট খোলায় নয়; ঋণ বিতরণেও। গ্রাহকের লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণ করা গেলে প্রচলিত ব্যাংকের নিয়মিত ক্রেডিট ইতিহাস না থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নতুনভাবে ব্যাংকিংয়ের আওতায় আসতে পারে।

কিন্তু এখানেই প্রশ্নও বড়। কোন তথ্যের ভিত্তিতে একজন গ্রাহককে ঋণযোগ্য বলা হবে, অ্যালগরিদম কতটা নির্ভুল হবে এবং সেই সিদ্ধান্তে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে—এসবের ওপর নির্ভর করবে ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা।

প্রযুক্তিই শক্তি, প্রযুক্তিই ঝুঁকি
ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সুবিধা যেখানে প্রযুক্তি, সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও সেখানে। সাইবার হামলা, পরিচয় জালিয়াতি, অ্যাকাউন্ট দখল, তথ্য ফাঁস কিংবা প্রযুক্তিগত বিপর্যয় ঘটলে তার প্রভাব শুধু একটি অ্যাপের ওপর পড়বে না; সরাসরি পড়বে গ্রাহকের অর্থ ও ব্যাংকের প্রতি আস্থায়।

প্রচলিত ব্যাংকে গ্রাহকের সামনে একজন কর্মকর্তা থাকেন। ডিজিটাল ব্যাংকে সেই সম্পর্কের বড় অংশই হবে পর্দার আড়ালে থাকা প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সঙ্গে। ফলে শক্তিশালী পরিচয় যাচাই, তথ্য সুরক্ষা, প্রতারণা শনাক্তকরণ এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা ছাড়া ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তার উল্টো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এলওআইয়ের পর আসল পরীক্ষা
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আবেদনকারীদের সাইবার নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে শর্ত দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো শর্ত পূরণ করে প্রস্তুতির কথা জানালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা যাচাই করবে। সবকিছু সন্তোষজনক হলে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে।

ফলে পাঁচটি এলওআইকে ডিজিটাল ব্যাংকের শেষ সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বরং চূড়ান্ত লাইসেন্সের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার শুরু। এখন দেখতে হবে—যারা বড় গ্রাহকভিত্তি, প্রযুক্তি ও মূলধনের শক্তি নিয়ে মাঠে নামছে, তারা সেই শক্তিকে কতটা নিরাপদ, সুশাসিত ও টেকসই ব্যাংকিং সেবায় রূপ দিতে পারে। কারণ ব্যাংকের ঠিকানা মোবাইলের পর্দায় বদলালেই ব্যাংকিং বদলে যায় না।

এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন