প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি নাটোরের কাঁচাগোল্লা। স্বাদ ও ঐতিহ্যের কারণে দেশজুড়ে রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা। ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট দেশের ১৭তম জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় নাটোরের কাঁচাগোল্লা। তবে জিআই স্বীকৃতির পরও এই মিষ্টির মান সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। এ সুযোগে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি ভেজাল মিষ্টিকে কাঁচাগোল্লা নামে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসনের কার্যক্রম মূলত বছরে এক দিনের উদ্বুদ্ধকরণ সভা ও বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় কাঁচাগোল্লার নামে নিম্নমানের মিষ্টি বাজারজাত করছেন। বিশেষ করে নাটোর বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও বিভিন্ন পরিবহনে ময়দার তৈরি লাড্ডুকে কাঁচাগোল্লা হিসেবে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত কাঁচাগোল্লার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা।
ঐতিহ্যের দীর্ঘ ইতিহাস
জনশ্রুতি অনুযায়ী, সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাটোরের লালবাজারে মধুসূদন পালের দোকানে কাঁচাগোল্লার উৎপত্তি। ১৭৫৭ সাল থেকে এটি ব্যাপক পরিচিতি পেতে শুরু করে। একদিন কারিগর না আসায় বিপুল পরিমাণ ছানা নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে চিনির রসে বেশি সময় জ্বাল দেওয়ার পর ভিন্ন স্বাদের যে মিষ্টি তৈরি হয়, সেখান থেকেই কাঁচাগোল্লার প্রচলন বলে স্থানীয়দের ধারণা।
কাঁচা ছানা দিয়ে তৈরি হওয়ায় এর নাম হয় ‘কাঁচাগোল্লা’। প্রচলিত গোলাকার মিষ্টির মতো দেখতে না হলেও ঝরঝরে ও হালকা রসাল হওয়াই এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রানী ভবানীর শাসনামলে নাটোরের এই মিষ্টির সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে। রাজপরিবারের অতিথিদেরও কাঁচাগোল্লা দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো বলে জানা যায়।
কমছে বিক্রি, বাড়ছে ভেজালের অভিযোগ
ঐতিহ্যবাহী জয়কালী বাড়ি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী রবীন্দ্র নাথ কুন্ডু বলেন, ‘১৯৮০ সাল থেকে আমি দোকানে বসছি। একসময় আমরা প্রতিদিন কয়েক মণ মিষ্টি বিক্রি করেছি। এখন দিনে এক মণও হয় না। মানসম্পন্ন কারিগরের অভাব এবং বাজারের বর্তমান অবস্থায় আমরা শুধু বাপ-দাদার আমলের সুনাম ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রকৃত কাঁচাগোল্লার সঙ্গে নিম্নমানের মিষ্টির পার্থক্য না জানায় অনেক ক্রেতাই প্রতারিত হচ্ছেন। এতে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী পণ্যটির সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
জড়িত শত শত পরিবার
কাঁচাগোল্লাকে ঘিরে নাটোরের স্থানীয় অর্থনীতিতেও রয়েছে বড় ধরনের কর্মসংস্থান। জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক দোকানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার কেজি কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬ লাখ টাকা।
নিচাবাজারের মৌচাক মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, লালবাজারের জয়কালী বাড়ি এবং নাটোর রেলস্টেশনের ঘোষ মিষ্টান্ন দোকানে কাঁচাগোল্লার বেচাকেনা বেশি। খামারি ও দুধ বিক্রেতা থেকে শুরু করে ছানা প্রস্তুতকারী, কারিগর, দোকানি ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে এই ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শত শত পরিবার যুক্ত।
রপ্তানির উদ্যোগ নেই
দেশজুড়ে পরিচিতি থাকলেও কাঁচাগোল্লাকে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়া কিংবা বিদেশে রপ্তানির জন্য এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।
নাটোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. আব্দুল মান্নাফ বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আমাদের দেশে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসন এগিয়ে না এলে কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব নয়। ব্যক্তি উদ্যোগে এটি সম্ভব নয়। রপ্তানিমুখী বাজারজাত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ প্রয়োজন।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচাগোল্লার ঐতিহ্য ও মান ধরে রাখতে নিয়মিত বাজার তদারকি, মান নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ কারিগর তৈরি এবং উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জিআই পণ্যের স্বীকৃত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কাঁচাগোল্লা উৎপাদন ও বাজারজাত নিশ্চিত করা গেলে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এসব বিষয়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তারের মন্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি ব্যস্ত থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।
কালের আলো/এমএসআইপি

নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১২:৩৩ অপরাহ্ণ