জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) শিক্ষার্থীর তুলনায় আবাসন সুবিধা অপ্রতুল হওয়ায় ৭০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস ও ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে বাড়তি বাসাভাড়ার পাশাপাশি লোডশেডিং, পানির সংকট, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও নিরাপত্তাসহ নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের।
আবাসন সংকট কমাতে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি আবাসিক হল নির্মাণের কাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা শেষ হয়নি। এরই মধ্যে দুই দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে নতুন হল দুটি কবে নাগাদ শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জাককানইবিতে মোট শিক্ষার্থী রয়েছেন ৯ হাজার ৮১৪ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৪ হাজার ৮০৫ এবং ছাত্রী ৫ হাজার ৯ জন। বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ছাত্র ও দুটি ছাত্রী হলে মোট আসন রয়েছে ২ হাজার ৮৫৮টি।
অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ২৯ দশমিক ১২ শতাংশ আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। ছাত্রদের জন্য রয়েছে ১ হাজার ৪৯৪টি আসন, যা মোট ছাত্রের প্রায় ৩১ দশমিক ০৯ শতাংশ। আর ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ১ হাজার ৩৬৪টি আসন, যা মোট ছাত্রীর ২৭ দশমিক ২৩ শতাংশের সমান।
ফলে ৭০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে গড়ে ওঠা মেস ও ভাড়া বাসাই এসব শিক্ষার্থীর প্রধান ভরসা। তবে সেখানেও স্বস্তিতে নেই তারা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হলে আসন পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী দ্বিতীয় বর্ষে উঠেও আবাসিক হলে আসন পান না। এমনকি স্নাতকোত্তর পর্যায়েও অনেককে হলের আসনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।
ফোকলোর বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেজাবিন চৌধুরী বলেন, হলে আসন না পাওয়ায় তাকে মেসে থাকতে হচ্ছে। মেসভাড়া, সিলিন্ডার গ্যাস ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর ওপর নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে পড়াশোনায়ও সমস্যা হচ্ছে। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ আনাস বলেন, আশপাশের বাসাগুলোর সুযোগ-সুবিধার তুলনায় ভাড়া বেশি। এর সঙ্গে লোডশেডিং, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল ও বাড়িওয়ালাদের অসহযোগিতার কারণে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট কমাতে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে এক হাজার ৬০০ আসনবিশিষ্ট দুটি ১০ তলা আবাসিক হলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। পরে দুই দফা মেয়াদ বাড়ানো হলেও এখনো নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্মাণাধীন ভবন দুটিতে অল্পসংখ্যক শ্রমিক কাজ করছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে একাধিক ভবনের নির্মাণকাজ চলায় শ্রমিক সংকটসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে হল দুটির কাজের গতি কমেছে। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সি এস আই কনস্ট্রাকশন লিমিটেড।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের হল নির্মাণের কাজ শুরুর বেশ কিছুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের জন্য ১০ তলা বিশিষ্ট কোয়ার্টার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সেই কোয়ার্টারের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। গত জুলাই থেকে কর্মচারীরা সেখানে বসবাস শুরু করেছেন।
তবে কর্মচারীদের কোয়ার্টার নির্মাণ শেষ হয়ে ব্যবহার শুরু হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মাণাধীন দুটি হলের কাজ এখনো চলমান। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষও রয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ার জুয়েল মিয়া বলেন, ভবন দুটির অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার আশা করছেন তারা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদে বারবার পরিবর্তন ও ফাইল আটকে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
প্রকল্পের ধীরগতির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ মোফাছিরুল ইসলাম বলেন, উপাচার্যের অনুমতি ছাড়া প্রকল্পের বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। তবে বর্ধিত সময়সীমা অনুযায়ী ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মো. আশরাফুল আলম বলেন, আবাসন সংকটের বিষয়টি প্রশাসনের জানা আছে। বর্তমানে চারটি হলের পাশাপাশি আরও দুটি হল নির্মাণাধীন। নতুন হল দুটি দ্রুত চালুর বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এগুলো চালু হলে আবাসন সংকট অনেকটাই কমবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোশারফ হোসেন বলেন, নতুন দুটি হলের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সেপ্টেম্বরেই ভবন দুটি হস্তান্তরের কথা রয়েছে। প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে আসন বরাদ্দ দেওয়ার আশা করছেন তিনি।
উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন দুটি হলে প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হবে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যের সঙ্গে চলতি বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের আসন দেওয়ার প্রশাসনিক আশার মধ্যে সময়ের পার্থক্য রয়েছে। ফলে নতুন হল দুটি কবে নাগাদ পুরোপুরি চালু হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে আবাসিক সুবিধার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বাড়তি খরচে মেস ও ভাড়া বাসায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বাসাভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের পাশাপাশি লোডশেডিং, পানির সংকট, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যাও তাদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, নির্মাণাধীন দুটি হলের কাজ দ্রুত শেষ করে তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে। নতুন আবাসিক হলগুলো চালু হলে একদিকে যেমন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস ও ভাড়া বাসায় থাকার কারণে তাদের যে বাড়তি আর্থিক ও দৈনন্দিন চাপ তৈরি হচ্ছে, সেটিও অনেকটা কমবে।
কালের আলো/এসএ

শিক্ষা ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৬:১০ অপরাহ্ণ