নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিত্বকারী সেই মঞ্চে এবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বক্তব্য উচ্চারিত হলো বাংলায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কণ্ঠে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণ তাই শুরু থেকেই আলাদা মাত্রা পেয়েছে। মাতৃভাষায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রের বক্তব্য তুলে ধরার প্রতীকী গুরুত্বের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারিবারিক ইতিহাসও। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য তিনি।
- জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় কণ্ঠ
- গণতন্ত্র, ‘থ্রি-আর’, রোহিঙ্গা, জলবায়ু, নারী, শিক্ষা ও এআই—এক বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রায় সব বড় অগ্রাধিকার
তবে ভাষণের ঐতিহাসিকতা কেবল এই দুই জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। বক্তব্যের বিষয়বস্তুও ছিল বিস্তৃত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, ফিলিস্তিন, বিশ্বশান্তি, অভিবাসন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—একটি ভাষণের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারই স্থান পেয়েছে।
বাংলায় শুরু, ‘বাংলাদেশ’কে সামনে রেখে
ভাষণের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বিশেষভাবে স্মরণ করেন ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের। এরপরই আসে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তি—’জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।’ এই বাক্যটি নিছক রাজনৈতিক ঘোষণা নয়। পুরো ভাষণের পরবর্তী অংশ বোঝার একটি চাবিকাঠি। কারণ তাঁর বক্তব্যে গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখানো হয়নি। রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকেও তিনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামোর অংশ হিসেবে হাজির করেছেন।
বাবা-মায়ের পর তৃতীয় অধ্যায়
জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমানের উপস্থিতির সঙ্গে পারিবারিক ইতিহাসের যোগটি ভাষণের শুরুতেই স্পষ্ট হয়েছে। তিনি নিজেই স্মরণ করেছেন তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার কথা। তিনি বলেন, ‘এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্বসমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।’ ফলে এটি একই পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের একটি নতুন অধ্যায়ও তৈরি করেছে।
‘থ্রি-আর’ দিয়ে রাষ্ট্র মেরামতের ঘোষণা
ভাষণের সবচেয়ে আলোচিত ধারণাগুলোর একটি ‘থ্রি-আর’—রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন। বাংলায় পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন অর্থাৎ ‘থ্রি-আর’ কৌশল অনুসরণ করছে।’ এই তিনটি শব্দের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, মানবসম্পদ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও এতে যুক্ত হয়েছে।
তরুণদের দক্ষ করে তোলা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ—এই পরিকল্পনার বাস্তব দিকগুলোও ভাষণে এসেছে। অর্থাৎ ‘থ্রি-আর’ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি ছাতার ধারণা হিসেবেও উপস্থাপিত হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের সরাসরি বার্তা
জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সংকটগুলোর একটি ছিল রোহিঙ্গা ইস্যু। এখানে প্রধানমন্ত্রী কোনো অস্পষ্ট বার্তা দেননি। তাঁর বক্তব্য, ‘বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।’ বাংলাদেশের অবস্থানের মূল কথাটি এখানেই—সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে। তবে প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি সংকটটির তাৎক্ষণিক মানবিক দিকটিও সামনে রেখেছেন। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাঁর প্রত্যাশা ছিল ‘দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের দাবি শুধু সহায়তা অব্যাহত রাখা নয়; নিরাপদ, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ ও কার্যকর উদ্যোগও নিশ্চিত করা।
জলবায়ু প্রশ্নে দাবি ও কর্মপরিকল্পনা একসঙ্গে
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও ছিল স্পষ্ট। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সীমিত হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বহনের বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তবে শুধু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবি তোলেননি। দেশের অভ্যন্তরে নেওয়া উদ্যোগগুলোরও হিসাব দিয়েছেন। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। এখানে বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে নয়, অভিযোজন ও পরিবেশ সুরক্ষায় নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী দেশ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
নারীর হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা
ভাষণে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নারীশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নকে যুক্ত করেছেন তিনি। নারী প্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি ‘নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক’। ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের সঙ্গে ভবিষ্যতে একটি ‘সার্বজনীন কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এই অংশে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও সমন্বিত করার একটি ধারণা সামনে এসেছে। একই সঙ্গে পরিবারভিত্তিক সহায়তায় নারীর ভূমিকা ও নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে।
শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ
শিক্ষা খাতে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতিটি দিয়েছেন, সেটিও বড়। আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের হিস্যা বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন তিনি। কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ ও পোশাক এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থার কথাও এসেছে। খেলাধুলাকেও শিক্ষার অংশ করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষা তাই শুধু শ্রেণিকক্ষের বিষয় নয়; দক্ষতা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ।
বিশ্বশান্তিতে কূটনীতির পক্ষে বাংলাদেশ
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।’ আরও বলেছেন, ‘মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।’ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রশ্নে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনরায় ঘোষণা করেছেন তিনি।
এআই নিয়ে নতুন বৈশ্বিক বৈষম্যের আশঙ্কা
ভাষণের শেষাংশে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেছেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ যেন নতুন বৈষম্য তৈরি না করে। তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত হোক।’ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকারের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের একটি কার্যকর বৈশ্বিক নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। এখানে বাংলাদেশের বক্তব্যটি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে নয়; ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অর্থনীতিতে বৈশ্বিক সমতার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
এক ভাষণে দেশের আয়না
তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এর বিস্তৃতি। তিনি কোনো একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেননি। দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন থেকে অর্থনীতি, রোহিঙ্গা থেকে জলবায়ু, নারী থেকে শিক্ষা, ফিলিস্তিন থেকে বিশ্বশান্তি, অভিবাসন থেকে এআই—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রশ্নেই বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে এতগুলো বিষয়কে বিচ্ছিন্ন মনে হয়নি। বক্তব্যের ভেতরে একটি অভিন্ন সূত্র ছিল—রাষ্ট্রের কেন্দ্রে জনগণ, আর উন্নয়নের কেন্দ্রে মানবিক মর্যাদা ও ক্ষমতায়ন।
শেষে তাঁর উচ্চারণ, ‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ।’ এই বাক্যটি পুরো ভাষণের রাজনৈতিক দর্শনকে সংক্ষেপ করেছে। বাংলায় জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ—ঐতিহাসিকতার জায়গাটি এখানেই শেষ নয়। এর ভেতর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্প, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পরিকল্পনা এবং বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের প্রত্যাশা—তিনটিই এক মঞ্চে হাজির করেছেন। বিশ্বমঞ্চে বাংলার এই উচ্চারণ তাই শুধু ভাষার বিষয় নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের নতুন সময়কে নিজের ভাষায় নিজের মতো করে তুলে ধরার একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বার্তা।
কালের আলো/এমএএএমকে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৭:১৬ অপরাহ্ণ