একসময় গাছ থেকে ঝরে পড়ে পচে যাওয়া সুপারি ছিল কৃষকের কাছে মূল্যহীন। এখন সেই ফেলনা সুপারি ঘিরেই কুড়িগ্রামের রাজারহাটে গড়ে উঠেছে নতুন আয়ের উৎস। বিভিন্ন গ্রাম থেকে ঝরে পড়া পচা সুপারি সংগ্রহ করে শুকানো, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতের পর তা পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। এতে একদিকে কমছে অপচয়, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান।
রাজারহাট উপজেলার দিনোবাজারে নিয়মিত বসছে শুকনো পচা সুপারির পাইকারি বাজার। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এ বাজারে অন্তত ১১ জন ব্যবসায়ী নিয়মিত পচা সুপারি কেনাবেচা করেন। মাসে প্রায় ৫০ টন সুপারি সংগ্রহ করে তারা মানভেদে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকা দরে কিনে থাকেন। পরে পরিষ্কার ও বাছাই শেষে ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাঠানো হয়।
ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রক্রিয়াজাত পচা সুপারি মূলত বাণিজ্যিক রং তৈরির কারখানা ও অন্যান্য রাসায়নিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে কৃষকের কাছে ফেলনা হিসেবে বিবেচিত পণ্যটি এখন বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান হয়ে উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে প্রায় ১ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে সুপারির বাগান রয়েছে। ফলন আহরণের পাশাপাশি ঝরে পড়া সুপারি সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতের কারণে স্থানীয়ভাবে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দিনোবাজারে সুপারি শুকানো ও বাছাইয়ের কাজে শতাধিক শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ নারী। উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও আরও অর্ধশতাধিক মানুষ এ পেশার সঙ্গে জড়িত।
ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৫০ টন পচা সুপারি বিভিন্ন স্থানে পাঠান। এ ব্যবসা থেকে মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিট লাভ হয়। আরেক ব্যবসায়ী লাভলু মিয়া জানান, তাঁর ব্যবসার সঙ্গে প্রায় ১০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
নারী শ্রমিক সাগরিকা বলেন, আগে কাজের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হতো। এখন বছরের প্রায় ছয় মাস নিয়মিত কাজ পান। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করে সংসারে সহযোগিতা করছেন। ছাটবান্ধা এলাকার শ্রমিক রেণুবালা জানান, সুপারি বাছাই ও শুকানোর কাজে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান।
তবে সম্ভাবনাময় এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সহজ ঋণ এবং আধুনিক শুকানোর প্রযুক্তির প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, আধুনিক ড্রায়ার মেশিন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা দেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদেশেও এ পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাজারহাট উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী বলেন, একসময় নর্দমায় ফেলে দেওয়া সুপারি এখন কৃষকের বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করেছে। এ ব্যবসার সঙ্গে কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিক—সবাই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। তবে খাতটি আধুনিক ও সম্প্রসারণে বর্তমানে তাঁদের হাতে কোনো নতুন সরকারি পরিকল্পনা বা প্রকল্প নেই।
কালের আলো/এমএসআইপি

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ