কিশোর গ্যাংয়ের সুতো কার হাতে?

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ

কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান হচ্ছে নিয়মিত। ধরা পড়ছে কিশোররা। হচ্ছে মামলা। কাউকে পাঠানো হচ্ছে আদালতে। কাউকে মুচলেকায় তুলে দেওয়া হচ্ছে অভিভাবকের হাতে। কিন্তু অপরাধের নেপথ্যে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক ‘বড় ভাই’দের বড় অংশই থেকে যাচ্ছে অদৃশ্য। ধরা পড়ছে অপরাধের দৃশ্যমান মুখ। যদিও অক্ষত থাকছে তার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

  • সামনে কিশোর, পেছনে প্রাপ্তবয়স্কদের নেটওয়ার্ক
  • চার হাজারের বেশি সক্রিয় সদস্য, গ্যাং ৩৮৬
  • অভিযান ও গ্রেপ্তারের বাইরে নেপথ্যের অর্থ
  • পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি

সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সি ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের পর জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করে পুলিশ। এর মধ্যে ৪৫১ কিশোরকে মুচলেকায় অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৭৩ জনকে সোপর্দ করা হয় আদালতে।

কিন্তু এত বড় অভিযানের পরও প্রশ্ন থেকে যায়—এই কিশোরদের অপরাধে নামাল কারা? অস্ত্র, অর্থ কিংবা আশ্রয় এল কোথা থেকে? আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো ‘বড় ভাই’ বা শেল্টারদাতা ছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।

গ্যাং বাড়ছে, থামছে না অভিযানেও
পুলিশের তথ্যেই সংকটের বিস্তার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের শেষ দিকে পুলিশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে কিশোর গ্যাং ছিল ১৭৩টি। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে সেই সংখ্যা ৩৮৬। চার বছরেরও কম সময়ে সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। সক্রিয় সদস্য চার হাজারের ওপরে।

রাজধানীতে দেড় শতাধিক গ্যাংয়ের সদস্য প্রায় দুই হাজার। ঢাকার বাইরে সক্রিয় ২২৭টি গ্যাংয়ের সদস্য প্রায় ২ হাজার ৫৫০ জন। চট্টগ্রাম মহানগরেই রয়েছে ৯৮টি গ্যাং। সিলেটে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুরে ১৩টি করে এবং খুলনায় সাতটি।

সংখ্যার এই বৃদ্ধি দেখাচ্ছে, কিশোর গ্যাং আর বিচ্ছিন্ন কিছু কিশোরের অপরাধ নয়। এটি এখন স্থানীয় পর্যায়ে বিস্তৃত একটি অপরাধী কাঠামো—যার সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

সামনে ‘ছোট ভাই’, পেছনে বড়রা
ডিএমপির একটি থানার সাবেক ওসি এস এম জাকারিয়ার অভিজ্ঞতায় অনেক কিশোর গ্যাংয়ে তিন স্তরের কাঠামো রয়েছে—‘বড় ভাই’, ‘মেজো ভাই’ ও ‘ছোট ভাই’। ২৫ বছরের বেশি বয়সিরা বড় ভাই, ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সিরা মেজো ভাই এবং ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সিরা ছোট ভাই গ্রুপে থাকে।

বড়দের ছত্রচ্ছায়ায় মেজো ভাইয়েরা চাঁদাবাজি, খুন, অস্ত্র দিয়ে হামলা ও মারামারির মতো গুরুতর অপরাধে জড়ায়। ছোটদের ব্যবহার করা হয় চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে। এই কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—অপরাধের সময় সামনে থাকে কিশোর, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ থাকে পেছনে। ফলে পুলিশের হাতে সহজে আসে ‘হাত’, অথচ ‘মাথা’ থেকে যায় আড়ালে।

পৃষ্ঠপোষক বদলালেও কাঠামো বহাল
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতি ও প্রভাবশালীদের সম্পর্কের অভিযোগও পুরোনো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে পুলিশের এক প্রতিবেদনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২১ কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাংকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর আগেও পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে শেল্টারদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু অভিযোগের পর কতজন পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে তদন্ত, মামলা কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়েছে—তার পরিষ্কার হিসাব নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পৃষ্ঠপোষক বদলালেও মাঠপর্যায়ের গ্যাং কাঠামো টিকে আছে। কোথাও কোথাও যুক্ত হয়েছে নতুন সদস্যও।

বয়সের সুরক্ষায় প্রভাবশালীদের সুযোগ
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুকের মতে, শিশু-কিশোরদের বয়স বিবেচনায় আইনে থাকা সুযোগকে ব্যবহার করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের সহজ টার্গেটে পরিণত করছেন।

তার মতে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আইনের দুর্বলতাও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বিস্তারের পেছনে ভূমিকা রাখছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এক দশকের বেশি সময় ধরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঘটলেও রাষ্ট্র এখনো এর মূল চালিকাশক্তিকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি। স্থানীয় পর্যায়ে কারা কিশোরদের আশ্রয় দিচ্ছে, কারা অর্থ বা অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে—অনেক ক্ষেত্রেই তা জানা থাকলেও ভয় ও প্রভাবের কারণে তা প্রকাশ্যে আসে না।

আইনের আওতায় আনতে হবে পৃষ্ঠপোষকদেরও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান হবে না; তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এখানেই কিশোর গ্যাং দমনের প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। ৬২৪ জনকে আটক করা হলো—কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন সক্রিয় গ্যাং সদস্য, কারা নির্দেশদাতা এবং কারা নেপথ্যে অর্থ-আশ্রয় দিচ্ছে, সেই স্তরগুলো আলাদা করে বের করতে হবে।

কালের আলো/এমএসআইপি/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন