এলপিজির সংকট কোথায়—আমদানিতে নাকি দামে?

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ২:১৬ অপরাহ্ণ

বাজারে এলপিজি আছে, কিন্তু চাহিদার তুলনায় অর্ধেক। সিলিন্ডারের জন্য দোকানে দোকানে ঘুরছেন ভোক্তা! কোথাও পাওয়া গেলেও দিতে হচ্ছে বাড়তি দাম। আর এই সংকটের নেপথ্যে উঠে আসছে আমদানির খরচের বড় পরিবর্তন। এলপিজি আমদানিতে টনপ্রতি প্রিমিয়াম এক লাফে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩০০ ডলারে উঠেছে। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামে সেই বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ নেই। ফলে অনেক আমদানিকারক নতুন করে এলপিজি আনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

  • বাজারে চাহিদার অর্ধেক সরবরাহ
  • প্রিমিয়াম দ্বিগুণ হলেও নির্ধারিত দামে সমন্বয় নেই
  • মুখোমুখি বিইআরসি–আমদানিকারক

খুচরা বাজারে এর প্রভাব ইতিমধ্যে স্পষ্ট। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। গত দুই মাস ধরে বাজারে এটি প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হলেও গত কয়েক দিনে দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১৫০ টাকায়। অর্থাৎ প্রচলিত বাজারদরের তুলনায় বেড়েছে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা; আর সরকারি দামের তুলনায় বেশি দিতে হচ্ছে ৫৬৫ টাকা পর্যন্ত।

চাহিদা ২০০, সরবরাহ ১০০
রাজধানীর খুচরা বাজারে সংকটের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে সরবরাহের হিসাবেই। বনশ্রী সি ব্লকের এক বিক্রেতা জানান, ২০০ সিলিন্ডারের অর্ডার দিলে এক সপ্তাহ পর পাওয়া যাচ্ছে ১০০টি। অর্থাৎ চাহিদার অর্ধেকও পূরণ হচ্ছে না। রামপুরার বাসিন্দা আনিসুর রহমান জানান, গত মাসেও ১ হাজার ৮০০ টাকায় একটি সিলিন্ডার কিনেছেন। বুধবার একই সিলিন্ডারের জন্য তাকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ১৫০ টাকা। বাড়তি দামের কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতা জানিয়েছেন, কোম্পানি থেকেই দাম বেড়েছে।

খুচরা পর্যায়ের এই সংকটকে শুধু বাজার কারসাজি হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি বাদ পড়ে যায়। কারণ সরবরাহ কমার সঙ্গে আমদানিকারকদের নতুন চালান আনার অনাগ্রহের সম্পর্ক রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

প্রিমিয়ামই বড় বাধা
টিএমএসএস এলপিজির কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, গত মাসেও এলপিজি আমদানিতে টনপ্রতি প্রিমিয়াম ছিল ১২০ থেকে ১৬০ ডলারের মধ্যে। এখন তা বেড়ে প্রায় ৩০০ ডলারে উঠেছে। এই প্রিমিয়াম মূলত জাহাজভাড়া ও ট্রেডারের বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল দাম অপরিবর্তিত থাকলেও দেশে পৌঁছানোর আগেই আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

সমস্যা হচ্ছে, বিইআরসি মাসের শুরুতে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয়। চলতি মাসের দামও ২ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে সেই বাড়তি খরচ তাৎক্ষণিকভাবে খুচরা দামে সমন্বয়ের সুযোগ থাকে না। ফলে আমদানিকারকের সামনে তৈরি হচ্ছে কঠিন হিসাব—বাড়তি প্রিমিয়াম দিয়ে এলপিজি আনলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করে লোকসানের ঝুঁকি, আর না আনলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা।

আমদানি থাকলেও সংকট
বিইআরসি অবশ্য বাজারে সরবরাহ সংকটের কথা মানতে নারাজ। সংস্থাটির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি এসেছে। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত এসেছে ১ লাখ ১৯ হাজার টন। আগের মাসগুলোতেও ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে।

তার বক্তব্য, আমদানির এই পরিমাণ বিবেচনায় বাজারে সংকট থাকার কথা নয়। আমদানিকারকেরা যে পরিমাণ প্রিমিয়াম বৃদ্ধির কথা বলছেন, সেটিও বিইআরসির কাছে অতিরিক্ত বলে মনে হচ্ছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে প্রিমিয়াম ছিল ১৬০ ডলার; এখন আমদানিকারকেরা ৩০০ ডলার চাইছেন।

এখানেই সংকটের দুটি ভিন্ন ছবি সামনে আসছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার হিসাবে দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি আসছে। অন্যদিকে খুচরা বাজার বলছে, চাহিদা অনুযায়ী পণ্য মিলছে না। আর আমদানিকারকদের যুক্তি—বাড়তি প্রিমিয়ামের কারণে নতুন চালান আনা অর্থনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে।

দামের হিসাবেও ফাঁক
বিইআরসি প্রতি মাসে সৌদি আরামকোর নির্ধারিত প্রোপেন ও বিউটেনের দাম, জাহাজভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম বিবেচনায় নিয়ে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। দেশে আমদানি করা এলপিজিতে প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫।

গত মাসের সৌদি সিপি অনুযায়ী প্রোপেনের দাম ছিল টনপ্রতি ৬২৫ ডলার এবং বিউটেন ৬৬০ ডলার। গড় দাম দাঁড়ায় ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার। এর সঙ্গে টনপ্রতি ১৬০ ডলার জাহাজভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম এবং ডলারের ১২৩ দশমিক ৩০ টাকা বিনিময় হার ধরে সেপ্টেম্বরের দাম নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু বাজারের বাস্তবতা যদি ১৬০ ডলারের জায়গায় ৩০০ ডলারের প্রিমিয়াম দাবি করে, তাহলে নির্ধারিত মূল্য ও আমদানি ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়। এই ব্যবধানই শেষ পর্যন্ত সরবরাহে প্রভাব ফেলছে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

সংকট ঘনীভূত হওয়ার শঙ্কা
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আমদানিকারকদের কয়েকজন ইতিমধ্যে বিইআরসিকে জানিয়েছেন, আগামী মাসের এলপিজি আনার জন্য তারা জাহাজ পাচ্ছেন না। অর্থাৎ বর্তমান সংকট কেবল খুচরা বাজারের সাময়িক ঘাটতি নয়; আমদানি ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে আগামী মাসে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশে এক কোটির বেশি পরিবার এলপিজি ব্যবহার করে। প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ সীমিত হওয়া এবং জ্বালানি কাঠের দাম বাড়ার কারণে আবাসিক বাজারে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। একই সঙ্গে পরিবহন ও শিল্পেও এর ব্যবহার বাড়ছে। তাই এলপিজির সংকট মানে শুধু একটি সিলিন্ডারের দাম বাড়া নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে কোটি মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে।

কালের আলো/আরআই/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন