জাতিসংঘে ভারত-পাকিস্তান বাকযুদ্ধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১:৩৬ অপরাহ্ণ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনকে ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। কাশ্মীর, সন্ত্রাসবাদ, মানবাধিকার, ধর্মীয় সহনশীলতা ও সিন্ধু পানি চুক্তি—বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা পরস্পরের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্য দিয়েছেন।

শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক, কাশ্মীর ও সিন্ধু পানি চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরেন। ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়োচিত হস্তক্ষেপের কারণে ওই সংঘাত থেমেছিল।

শরিফ বলেন, দক্ষিণ এশিয়া যেন ২০২৫ সালের মতো ভয়াবহ সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে আর কখনো না পৌঁছায়, সে জন্য কাশ্মীর সমস্যার একটি ন্যায্য ও সুষ্ঠু সমাধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি সিন্ধু পানি চুক্তি পুনরায় কার্যকর করার দাবি জানান।

এ ছাড়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার ও ধর্মীয় সহনশীলতা নিয়েও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।

এর জবাবে শনিবার জাতিসংঘে ‘রাইট অব রিপ্লাই’ বা জবাব দেওয়ার অধিকার প্রয়োগ করে পাকিস্তানের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন ভারতের কূটনীতিক পেটাল গেহলট। তিনি শেহবাজ শরিফের বক্তব্যকে ‘অদ্ভুত, হাস্যকর ও ভণ্ডামিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন।

ভারতীয় প্রতিনিধি সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলো তুলে ধরেন। তিনি জাতিসংঘকে স্মরণ করিয়ে দেন, ৯/১১ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে পাকিস্তানি সামরিক একাডেমির কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন।

পেটাল গেহলট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এই মাত্র ৯/১১ হামলার বার্ষিকী পালন করল। আর সেই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রধান একাডেমির একেবারে দোরগোড়ায় বসবাস করছিলেন।’

পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদবিরোধী অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, পাকিস্তান দিনে নিরাপত্তা বজায় রাখার দাবি করে, আর রাতের আঁধারে সন্ত্রাসবাদ ছড়ায়।

ভারতীয় প্রতিনিধি আরও বলেন, গত বছর ভারত প্রমাণ করেছে যে সন্ত্রাসীদের পালানোর কোনো পথ নেই এবং লুকিয়ে থাকারও কোনো জায়গা নেই। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার অধিকার ভারত প্রয়োগ করবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

২০২৫ সালের পেহেলগাম হামলার প্রসঙ্গও ভারতের বক্তব্যে উঠে আসে। ভারতীয় পক্ষের দাবি, ওই হামলায় ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী অবকাঠামো লক্ষ্য করে ৭ মে ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করা হয়।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাত থামাতে তাঁর ভূমিকা ছিল। তবে ভারত সরকার বরাবরই কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার বিষয়টি অস্বীকার করে এসেছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ভারতীয় প্রতিনিধি বলেন, পাকিস্তান ও দেশটির নীতিকে তাদের প্রতিনিধিরা যেভাবে উপস্থাপন করেন, সেভাবে নয়; বরং তাদের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।

পেটাল গেহলট বলেন, বছরের পর বছর একই ধরনের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করলেই তা সত্য হয়ে যায় না। পাকিস্তানের ‘দ্বিমুখী নীতি’ ও ‘প্রতারণা’ তাদের নিজেদের কিংবা বিশ্বের কোনো উপকারে আসবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কাশ্মীর ও মানবাধিকার নিয়ে পাল্টাপাল্টি

জাতিসংঘে ভারতের বক্তব্যে জম্মু ও কাশ্মীরের অবস্থানও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। ভারতীয় প্রতিনিধি জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের ‘অবিচ্ছেদ্য ও অপরিবর্তনীয় অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

একই সঙ্গে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি। রাওলাকোটের জনগণের কাছে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে কথিত নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে আহ্বান জানান।

পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন ভারতীয় প্রতিনিধি। তিনি অভিযোগ করেন, পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর প্রভাবই রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনীর হাতেই থাকে—এমন দাবি করেন তিনি।

ধর্মীয় সহনশীলতা নিয়ে শেহবাজ শরিফের বক্তব্যের জবাবেও পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি ও ব্লাসফেমি আইন নিয়ে প্রশ্ন তোলে ভারত।

এর আগে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলেও দুই দেশের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। ভারতীয় কূটনীতিক ক্ষিতিজ ত্যাগী পাকিস্তানকে অন্য দেশের ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা কিংবা সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের পরিবর্তে নিজেদের অর্থনৈতিক সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া এবং হাফিজ সাঈদের বিচার নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি।

শুক্রবার এক পাকিস্তানি সাংবাদিক ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কাছে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে জয়শঙ্কর পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘একটি সন্ত্রাসী দেশ আমাকে এই প্রশ্ন করছে?’

সব মিলিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে সামনে এসেছে। কাশ্মীর থেকে সন্ত্রাসবাদ এবং সিন্ধু পানি চুক্তি থেকে মানবাধিকার—বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান যে এখনো ব্যাপকভাবে পরস্পরবিরোধী, এবারের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন