ডিআর কঙ্গোতে ইবোলায় আক্রান্ত ৭,৮৯০, মৃত্যু ৩,৭৯৯

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১:৫৭ অপরাহ্ণ

গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটিতে ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৮৯০ জন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ৩ হাজার ৭৯৯ জন। অর্থাৎ, শনাক্ত আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকই প্রাণ হারিয়েছেন।

চলমান সশস্ত্র সংঘাত ও মানুষের বাস্তুচ্যুতির কারণে ইবোলা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর্মীদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানো, তাঁদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত করা এবং দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের সীমান্তবর্তী দক্ষিণ উবাঙ্গি গভর্নরেটের বুলু এবং দক্ষিণ সুদানের সীমান্তবর্তী ওত-উয়েলে প্রদেশের দুঙ্গুতে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেন, সংঘাত ও মানুষের বাস্তুচ্যুতির কারণে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো এবং ভাইরাসের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, সংঘাতের কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং কিছু এলাকায় যাতায়াতও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে ইবোলা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

টেড্রোস আরও জানান, বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনের চিকিৎসা কঠিন, কারণ এই স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা নেই। তবে ইবোলার টিকা ও চিকিৎসা নিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে ডব্লিউএইচও।

সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ

ইবোলা মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত করা। বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসতে পারেন—এমন ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে কাজ করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় শনাক্ত করা ব্যক্তির সংখ্যা এখনো অনেক কম।

আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (আফ্রিকা সিডিসি) মহাপরিচালক ড. জ্যাঁ কাসেইয়া বলেন, ৭ হাজারের বেশি নিশ্চিত আক্রান্তের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, তাঁদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ হাজার ব্যক্তিকে শনাক্ত করে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ডিআর কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইতুরি প্রদেশে। মে মাসে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে প্রদেশটিতে ৬ হাজার ৩২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ২১ দিনেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৬৮ জন।

এরপর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে উত্তর কিভু প্রদেশে। সেখানে মোট ১ হাজার ৪৮০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ২১ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৬৭ জন।

রবিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন উত্তর কিভু প্রদেশে ঘটছে।

তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কিভুতে শনাক্ত হওয়া রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশ মারা গেছেন। এই মৃত্যুহার ডিআর কঙ্গোর জাতীয় গড় ৪৮ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ায় বাড়ছে ঝুঁকি

স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, অনেক রোগী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে চাইছেন না। ফলে দেরিতে চিকিৎসা শুরু হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে সংক্রমণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের কাজও কঠিন হয়ে পড়ছে।

উত্তর কিভুর বুটেম্বোর একটি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ড. মিশেল পালুকু মুকুলোলি বলেন, অনেক রোগী মনে করেন হাসপাতালে গেলে তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো হবে এবং সেখানে তাঁদের মৃত্যু হবে।

তাঁর মতে, রোগীদের এই ভয় ইবোলা শনাক্ত ও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেক রোগী চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

উত্তর কিভু প্রদেশে এর আগেও তিনবার ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবটি ছিল চলতি বছরের আগ পর্যন্ত ডিআর কঙ্গোর সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব।

তবে আগের এসব প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ছিল ইবোলা ভাইরাসের ভিন্ন একটি ধরন—‘জায়ার স্ট্রেইন’। এবারের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বুন্দিবুগিও স্ট্রেইন সম্পর্কে এখনো তুলনামূলকভাবে কম তথ্য জানা গেছে।

স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, সংক্রমণের শুরুর দিকে বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনে আক্রান্ত রোগীদের অনেকের উপসর্গ তুলনামূলকভাবে মৃদু থাকে। ফলে এসব উপসর্গ ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েডের মতো সাধারণ রোগের উপসর্গ বলে ভুল হতে পারে।

এ কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, চিকিৎসা নিয়ে মানুষের ভয় এবং রোগ শনাক্তকরণে ঘাটতি—সব মিলিয়ে ডিআর কঙ্গোতে ইবোলা মোকাবিলায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন