বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের মূল ভরকেন্দ্র এখনো তৈরি পোশাক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক থেকেই এসেছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার, অর্থাৎ মোট রপ্তানির প্রায় ৮১ শতাংশ।
- চামড়া, পাট, কৃষি ও প্রকৌশল পণ্যে প্রবৃদ্ধি
- বৈচিত্র্যের সম্ভাবনার পাশাপাশি কমপ্লায়েন্স
- মান ও মূল্য সংযোজনই বড় পরীক্ষা
তবে পোশাকের বাইরে থাকা খাতগুলোও ধীরে ধীরে নিজেদের পরিসর বাড়াচ্ছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি এবং প্রকৌশল পণ্যে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি রপ্তানি বহুমুখীকরণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
প্রবৃদ্ধির চার ইঞ্জিন
তৈরি পোশাকের বাইরে সবচেয়ে আলোচিত খাতগুলোর একটি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ১২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশের চামড়ার বৈশ্বিক চাহিদা থাকলেও রপ্তানির বড় অংশ এখনো তুলনামূলক কম মূল্য সংযোজনের পণ্যে সীমিত। এই জায়গাতেই রয়েছে বড় সুযোগ। জুতা, ব্যাগ, ওয়ালেট, বেল্টসহ ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পণ্যে উৎপাদন বাড়ানো গেলে একই কাঁচামাল থেকে বেশি রপ্তানি আয় সম্ভব। তবে সেই সম্ভাবনার পথে বড় বাধা পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স।
বিশেষ করে ট্যানারিশিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহর ভাষ্য, সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরোপুরি কার্যকর না হলে বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা কঠিন।
পাটে ফিরছে নতুন বাজারের সম্ভাবনা
পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে পাট আবারও নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে রপ্তানি এসেছে প্রায় ৮৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
শুধু জুন মাসে এ খাতের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে জুট ব্যাগ, হোম ডেকর, কার্পেট ও পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ের বাজার বাড়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাজার সম্প্রসারণের জন্য শুধু কাঁচা পাট বা প্রচলিত পণ্য যথেষ্ট নয়। ডিজাইন, প্রযুক্তি, মাননিয়ন্ত্রণ ও ব্র্যান্ডিংয়ে বিনিয়োগ করেই পাটকে উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপ দিতে হবে।
বাংলাদেশ ডাইভারসিফায়েড জুট পণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মো. রাশেদুল করিম মুন্না বলেন, ইউরোপের ক্রেতারা এখন ডিজাইন করা ও সার্টিফায়েড পণ্য চাইছেন; তাই বিনিয়োগের কেন্দ্র হওয়া উচিত ডিজাইন ও উদ্ভাবন।
কৃষিতে উৎপাদনের চেয়ে বড় প্রশ্ন মান
বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বৈচিত্র্য এ খাতের অন্যতম শক্তি। সবজি, ফল, মসলা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও শুকনা খাবারের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুনে কৃষিপণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়েছে।
তবে উৎপাদন বাড়ালেই রপ্তানি বাড়বে—এমন সমীকরণ এখানে কার্যকর নয়। পণ্যের মান, সংরক্ষণব্যবস্থা, শীতল সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক সনদ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে কৃষি রপ্তানির পরবর্তী ধাপ হতে পারে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ।
প্রকৌশলে দ্রুত বাড়ছে সক্ষমতা
প্রকৌশল পণ্যও পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে উঠে আসছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৬৫ কোটি ২০ লাখ ডলার, আগের বছরের তুলনায় যা ২১ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। জুন মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, হালকা প্রকৌশল সামগ্রী, যন্ত্রাংশ ও ধাতব পণ্যে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে। এই খাতের গুরুত্ব শুধু রপ্তানি আয়ে নয়; শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা রয়েছে।
বৈচিত্র্যের পথে বাধা কোথায়
পরিসংখ্যান বলছে, পোশাকের বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানির একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই অংশকে বড় করতে হলে শুধু নতুন বাজার খোঁজা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি খাতেই আলাদা ধরনের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে—চামড়ায় পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স, পাটে ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিং, কৃষিতে মান ও সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রকৌশলে প্রযুক্তি ও উৎপাদন দক্ষতা।
ফলে রপ্তানি বহুমুখীকরণের মূল প্রশ্ন এখন আর শুধু ‘কোন খাতে সম্ভাবনা আছে’—তা নয়; বরং সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক মানের পণ্যে রূপান্তর করার সক্ষমতা কত দ্রুত তৈরি করা যায়। তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমানোর বাস্তব পথও শেষ পর্যন্ত সেখানেই।
কালের আলো/এএইচ/এমকে

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৯:২০ অপরাহ্ণ