প্লাস্টিকের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে রুদ্রপাড়ার মৃৎশিল্প

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম)সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১২:১৪ অপরাহ্ণ

একসময় বাঁশখালীর রুদ্রপাড়ায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শোনা যেত মৃৎশিল্পের চাকার ঘূর্ণনের শব্দ। মাটির দলা শিল্পীর নিপুণ হাতে রূপ নিত কলস, হাঁড়ি-পাতিল, থালা, বাটি, মটকা, সরা, সুরাই, ফুলের টবসহ নানা পণ্য। এখন সেই কর্মচাঞ্চল্য অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও অন্যান্য কৃত্রিম পণ্যের দাপটে কমেছে মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা। ফলে ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে রুদ্রপাড়ার মৃৎশিল্পের চাকা।

বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর ইউনিয়নের রুদ্রপাড়া একসময় মাটির তৈরি নানা পণ্যের জন্য পরিচিত ছিল। শুধু রুদ্রপাড়া নয়, উপজেলার পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালীপুর, বৈলছড়ি, জলদী, শীলকূপ, চাম্বল ও পুঁইছড়ি ইউনিয়নেও এসব পণ্যের বেশ চাহিদা ছিল।

মৃৎশিল্পীদের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হতো মাটিকে ঘিরে। পরিবারের কেউ মাটি সংগ্রহ করতেন, কেউ তা প্রস্তুত করতেন, আবার কেউ চাকা ঘুরিয়ে পাত্র তৈরি করতেন। শুকানোর পর পণ্য পোড়ানো হতো। পরে ভ্যান কিংবা মাথায় করে বিভিন্ন বাজারে নিয়ে বিক্রি করতেন তারা। সেই আয়েই চলত সংসার।

তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। সহজলভ্য, তুলনামূলক কম দাম ও দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে মানুষ এখন প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন আধুনিক পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। এতে মাটির পণ্যের বাজার সংকুচিত হয়েছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সে অনুযায়ী দাম বাড়াতে পারছেন না কারিগররা। ফলে দিনভর পরিশ্রম করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছে না।

রুদ্রপাড়ার মৃৎশিল্পী স্নিগ্ধ দাশ বলেন, প্রায় ২০-৩০ বছর ধরে তিনি এ কাজ করছেন। বছরে প্রায় ছয় মাস মৃৎশিল্পের মৌসুম থাকে। আগে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে পণ্য কিনে নিয়ে যেত। এখন প্লাস্টিক ও অন্যান্য সামগ্রীর সহজলভ্যতার কারণে মাটির পণ্য বিক্রি অনেক কমে গেছে। দিনভর কাজ করেও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

মৃৎশিল্পী সুজিত রুদ্র বলেন, বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি। একসময় পাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারই মাটির জিনিসপত্র তৈরি করত। এখন হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এ পেশায় আছে। চাহিদা কম থাকায় কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়। কখনো উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় লোকসানও গুনতে হয়।

শুধু আয়-রোজগার কমে যাওয়াই নয়, মৃৎশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন কারিগররা। পরিবারের নতুন প্রজন্মের অনেকেই এ পেশায় আসতে আগ্রহী নন। দীর্ঘ সময় পরিশ্রমের পরও নিশ্চিত আয় না থাকায় তরুণরা অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন। এতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্পের দক্ষতা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সচেতন মহল মনে করে, মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারিগরদের সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

কণ্ঠশিল্পী ও সামাজিক সংগঠক শাহাবুদ্দিন শিহাব বলেন, পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে মাটির পণ্য জনপ্রিয় করা গেলে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পও টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

রুদ্রপাড়ার মৃৎশিল্পীদের প্রত্যাশা, তাদের বংশপরম্পরার পেশা যেন কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। আবারও যেন ঘুরে ওঠে মৃৎশিল্পের চাকা, আর মাটির গন্ধে মুখর হয় কারিগরদের উঠোন।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন