বিশ্ব ফুটবলে একসময় জার্মানি মানেই ছিল সাফল্য, শৃঙ্খলা আর আধিপত্যের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চেনা জার্মানির ছবিটাই যেন বদলে গেছে। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকেই বড় কোনো সাফল্যের দেখা নেই দলটির। এবার নতুন কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপের অধীনে শুরুটা আশাব্যঞ্জক হওয়ার বদলে তৈরি করেছে নতুন প্রশ্ন।
নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্রয়ের পর ঘরের মাঠে গ্রিসের কাছে ১-০ গোলে হেরেছে জার্মানি। গ্রিসের বিপক্ষে এটি আবার জার্মানির ইতিহাসে প্রথম হার। এমন ফলের পর দলের বর্তমান অবস্থান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন সাবেক অধিনায়ক বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার।
‘আমরা আর শীর্ষ দল নই’
ম্যাচ শেষে সম্প্রচার ক্যামেরার সামনে জার্মানির পারফরম্যান্স নিয়ে নিজের হতাশার কথা জানান শোয়াইনস্টাইগার। সাবেক এই মিডফিল্ডারের মতে, জার্মানি এখন আর আগের মতো ইউরোপের শীর্ষ দলগুলোর একটি নয়।
শোয়াইনস্টাইগার বলেন, ‘আমরা আর শীর্ষ দল নই, মাঝারি মানের দলে পরিণত হয়েছি।’
জার্মানির হয়ে ১২১ ম্যাচ খেলা শোয়াইনস্টাইগার মনে করেন, বর্তমান দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রতিপক্ষের ওপর পর্যাপ্ত চাপ তৈরি করতে না পারা। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কিছুটা ভালো ফুটবল দেখা গেলেও গ্রিসের বিপক্ষে সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি দলটি।
ক্লপের শুরুটাও হতাশার
২০২৬ বিশ্বকাপের পর জার্মানির দায়িত্ব নিয়েছেন ইয়ুর্গেন ক্লপ। ক্লাব ফুটবলে দীর্ঘদিন বড় সাফল্য পাওয়া এই কোচের অধীনে শুরুতেই নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দুই ম্যাচে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
নেশনস লিগে নিজেদের প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে জার্মানি। এরপর ঘরের মাঠে গ্রিসের বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে বসে তারা।
তবে এই হারে এখনই হতাশ হয়ে পড়ছেন না ক্লপ। গ্রিসের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে তিনি এটিকে চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ক্লপ বলেন, ‘এটা প্রক্রিয়ার অংশ।’
নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া, একাদশে পরিবর্তন এবং দলের কাঠামো তৈরি—সবকিছুর দায়ও নিজের কাঁধে নিয়েছেন তিনি।
একাদশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা
২০২৮ ইউরো সামনে রেখে জার্মান দলকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চাইছেন ক্লপ। প্রথম চার ম্যাচের জন্য তিনি ৪৪ জন খেলোয়াড় নিয়ে দুটি স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন। মূল লক্ষ্য, যত বেশি সম্ভব খেলোয়াড়কে দেখে নেওয়া এবং তাদের মধ্য থেকে ভবিষ্যতের দল তৈরি করা।
সে কারণেই শুরুতেই ফলাফলের চেয়ে খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন ও নিজেদের কাঙ্ক্ষিত কৌশল বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ক্লপ।
গ্রিসের বিপক্ষে ম্যাচেও ছিল সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ছাপ। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শুরু করা একাদশ থেকে পাঁচটি পরিবর্তন করেন জার্মান কোচ। নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি মাঠে তাঁর চাওয়া খেলার ধরন কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও পরীক্ষা করেন।
ক্লপের মতে, দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে প্রায় ১৫ মিনিট জার্মানি কিছুটা নিজেদের কাঙ্ক্ষিত ছন্দ খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি দল।
নিয়ন্ত্রণ থাকলেও গোলের সুযোগ কম
গ্রিসের বিপক্ষে ম্যাচে বলের দখল ও নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে ছিল জার্মানি। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণকে কার্যকর আক্রমণে রূপ দিতে পারেনি তারা। পরিষ্কার গোলের সুযোগ তৈরিতেও ব্যর্থ হয়েছে দলটি।
উল্টো ম্যাচের ৭৪ মিনিটে দিমিত্রিয়োস কুরবেলিসের ডিফ্লেক্টেড শটে গোল হজম করে জার্মানি। শেষ পর্যন্ত সেই গোলই দুই দলের ব্যবধান গড়ে দেয়।
ম্যাচের ফল নিয়ে ক্লপ নিজেও সন্তুষ্ট নন। তিনি বলেন, ‘ম্যাচটি আমরা বড় ব্যবধানে না জিতলে, এমনকি জিততে না পারলেও আমি মেনে নিতে পারতাম। কিন্তু কোনোভাবেই হারা যেত না। অথচ আমরা ঠিক সেটাই করে বসলাম।’
‘ক্লপ কোনো জাদুকর নন’
শোয়াইনস্টাইগার অবশ্য জার্মানির এই অবস্থার জন্য শুধু ক্লপকে দায়ী করছেন না। তাঁর মতে, নতুন কোচের অধীনে একটি দলকে রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘ক্লপ কোনো জাদুকর নন। এটা কঠোর পরিশ্রমের ব্যাপার।’
সাবেক এই জার্মান তারকার মতে, খেলোয়াড়দেরও নিজেদের নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে। তাঁরা মাঠে যে পারফরম্যান্স দিচ্ছেন, সেটিই তাঁদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য কি না—সেটা নিয়েও ভাবতে হবে।
সামনে আরও দুটি ম্যাচ
চলমান ফিফা উইন্ডোয় জার্মানির সামনে আরও দুটি ম্যাচ রয়েছে। ১ অক্টোবর মিউনিখে সার্বিয়ার মুখোমুখি হবে তারা। এরপর ৪ অক্টোবর এথেন্সে গ্রিসের বিপক্ষে ফিরতি লেগ খেলবে জার্মানি।
এই দুই ম্যাচে ক্লপ তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা কতটা এগিয়ে নিতে পারেন এবং নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে কাঙ্ক্ষিত দলীয় কাঠামো কতটা দাঁড় করাতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কালের আলো/জেএন

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১২:৫৮ অপরাহ্ণ