সামরিক সক্ষমতার দৃশ্যমান অংশ হিসেবে অস্ত্র, সাঁজোয়া যান বা আধুনিক সরঞ্জাম যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোকে সচল রাখার প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ কিংবা শান্তিকাল—দুই পরিস্থিতিতেই সামরিক সরঞ্জামের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করার এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স (ইএমই) কোর। সময়ের সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় কোরটির দায়িত্বও এখন প্রচলিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় নীলফামারীর সৈয়দপুর সেনানিবাসস্থ ইএমই সেন্টার অ্যান্ড স্কুলে অনুষ্ঠিত ইএমই কোরের চলতি বছরের বাৎসরিক অধিনায়ক সম্মেলন এবং ৬ষ্ঠ কোর পুনর্মিলনী বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে। গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) থেকে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত দুই দিনের আয়োজনে একদিকে উঠে এসেছে কোরটির ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। অন্যদিকে, গুরুত্ব পেয়েছে আধুনিক প্রশিক্ষণ, পেশাগত উৎকর্ষ এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি।
- সৈয়দপুরে অধিনায়ক সম্মেলন ও ৬ষ্ঠ কোর পুনর্মিলনী
- আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর নির্দেশ
- ঐতিহ্য, পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতায় গুরুত্ব
প্রযুক্তির পরিবর্তনে বদলাচ্ছে দায়িত্বের ধরন
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ইএমই কোরের বিভিন্ন ইউনিটের অধিনায়ক ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্যে তিনি কোরটির কার্যক্রম, উন্নয়ন এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
সামরিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে একটি বাহিনীর প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের ধরন যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণেও প্রয়োজন হচ্ছে বিশেষায়িত জ্ঞান। ফলে শুধু যন্ত্রপাতি মেরামতের প্রচলিত দক্ষতা যথেষ্ট নয়; নতুন প্রযুক্তি বোঝা, দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কার্যকর সমাধান দেওয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনে আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার পেছনে এই পরিবর্তিত বাস্তবতাই গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করছে।

যুদ্ধক্ষমতার নেপথ্যে ইএমইর ভূমিকা
একটি সামরিক ইউনিটের অস্ত্র বা যানবাহন প্রযুক্তিগত কারণে অকার্যকর হয়ে পড়লে তার প্রভাব সরাসরি অপারেশনাল সক্ষমতার ওপর পড়ে। সে কারণে সামরিক সরঞ্জামের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়টি যুদ্ধ প্রস্তুতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইএমই কোর দীর্ঘদিন ধরে এই দায়িত্ব পালন করে আসছে।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর বক্তব্যে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী ইএমই কোরের বীর সেনানীসহ সব বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি ইএমই কোরের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য এবং যুদ্ধ ও শান্তিকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর অস্ত্র, যানবাহন ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে কোরটির গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, কোরটির বর্তমান সক্ষমতার আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি—দুটি বিষয়ই পাশাপাশি উঠে এসেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান প্রযুক্তির সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ সক্ষমতার ভিত্তি হতে পারে—আয়োজনের বিভিন্ন বক্তব্যে সেই বার্তাই প্রতিফলিত হয়েছে।
অধিনায়ক সম্মেলনে উন্নয়ন ও দক্ষতার সমীকরণ
বাৎসরিক অধিনায়ক সম্মেলন মূলত একটি পেশাগত পর্যালোচনা ও মতবিনিময়ের ক্ষেত্র। এখানে কোরের বিভিন্ন ইউনিটের অভিজ্ঞতা, কার্যক্রম ও উন্নয়নের বিষয়গুলো সামনে আসার সুযোগ তৈরি হয়। এবারের সম্মেলনেও ইএমই কোরের কার্যক্রম, উন্নয়ন এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়। সেনাবাহিনী প্রধান একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কোরের সদস্যদের সর্বদা প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেন। এর তাৎপর্য শুধু প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক ব্যবস্থায় দক্ষ জনবল তৈরি, বিশেষায়িত জ্ঞান ধরে রাখা এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত তা কাজে লাগানোর সক্ষমতাও এর অন্তর্ভুক্ত।

পুনর্মিলনীতে প্রজন্মের সেতুবন্ধন
একই আয়োজনে ইএমই কোরের ৬ষ্ঠ কোর পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়। ইএমই সেন্টার অ্যান্ড স্কুলের প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মনোমুগ্ধকর কোর পুনর্মিলনী কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। পরে তিনি ইএমই কোরের প্রাক্তন ও বর্তমান সদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। পুনর্মিলনী সাধারণত অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি সাংগঠনিক সেতু তৈরি করে। অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের অভিজ্ঞতা এবং কর্মরত সদস্যদের বর্তমান বাস্তবতা যখন একই পরিসরে মিলিত হয়, তখন পেশাগত ঐতিহ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির ধারাবাহিকতা আরও দৃঢ় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সেনাবাহিনী প্রধান তাঁর বক্তব্যে কোরের সদস্যদের মধ্যে ঐক্য, সৌহার্দ্য ও পেশাগত মমত্ববোধ বৃদ্ধিতে এই ধরনের আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
নেতৃত্বের উপস্থিতিতে ঐক্য ও ধারাবাহিকতার বার্তা
দুই দিনের অনুষ্ঠানে ইএমই কোরের কর্নেল কমান্ড্যান্ট ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিম, সেনাবাহিনীর মাস্টার জেনারেল অব দি অর্ডন্যান্স (এমজিও) মেজর জেনারেল আবু বকর সিদ্দিক খান, আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের ভারপ্রাপ্ত জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল খন্দকার মোহাম্মদ শাহিদুল এমরান, সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল (এজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসাইন আল মোরশেদ এবং ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও রংপুরের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল এবিএম ফয়সাল বাতেন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও সেনাসদর ও রংপুর এরিয়ার ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা এবং ইএমই কোরের বিভিন্ন ইউনিটের অধিনায়কেরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের এমন উপস্থিতি সম্মেলনের পেশাগত গুরুত্বের পাশাপাশি কোরটির কার্যক্রমের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতার যোগসূত্রও তুলে ধরে।

ঐতিহ্যকে শক্তিতে পরিণত করে ভবিষ্যতের পথে
ইএমই কোরের এবারের অধিনায়ক সম্মেলন ও পুনর্মিলনীকে তাই শুধু নিয়মিত সামরিক আয়োজন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর একদিকে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ ও দীর্ঘদিনের পেশাগত ঐতিহ্যের স্মরণ, অন্যদিকে রয়েছে দ্রুত পরিবর্তনশীল সামরিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর প্রত্যয়। অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রযুক্তিগত দায়িত্ব থেকে ভবিষ্যতের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা—ইএমই কোরের ভূমিকার পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় আধুনিক প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্য এবং অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাকে একসূত্রে গাঁথার ওপর এবারের আয়োজনের গুরুত্ব নিহিত। দেশ ও জাতির সেবায় নিবেদিত থাকার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই আয়োজন তাই কোরটির অতীতকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির দিকনির্দেশনাও সামনে এনেছে।
কালের আলো/এমএএএমকে

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৭:১৫ অপরাহ্ণ