বহর সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় কর্মসূচি নিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজের পর এবার আরও ১০টি এয়ারবাস কেনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই সংস্থার জন্য আন্তর্জাতিক আকাশে বড় পরিসরে বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে। নতুন প্রজন্মের ৩৫টি উড়োজাহাজের সরবরাহ পাইপলাইন শুধু বহরের আকারই বদলাবে না, বদলে দিতে পারে বিমানের রুট নেটওয়ার্ক ও ব্যবসায়িক সক্ষমতার কাঠামোও।
- দীর্ঘপথে এ৩৫০, মাঝারি রুটে এ৩২১নিও
- এয়ারবাস-বোয়িংয়ের আধুনিক বহরে বাড়ছে রুট
- সক্ষমতা ও সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সম্ভাবনা
একসঙ্গে ৩৫ নতুন উড়োজাহাজ
আগামী অক্টোবরে ১০টি এয়ারবাস কেনার চুক্তি করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত এমপি। প্রস্তাবিত বহরে থাকছে চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও। ২০৩৩ সাল থেকে এগুলো দেশে আসা শুরু হয়ে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সরবরাহ হওয়ার কথা।
এর আগে ২৫টি বোয়িং কেনার চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৩টি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং ১০টি ৭৩৭-৮। সব মিলিয়ে ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি হওয়ায় বিমানের বহর পরিকল্পনা পাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি। এটি একই সঙ্গে বহর আধুনিকীকরণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে অবস্থান শক্ত করার বড় সুযোগ।
দীর্ঘপথের আকাশ খুলবে এ৩৫০-এ
চারটি এ৩৫০-৯০০ বিমানের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হতে পারে দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক রুট। প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ যাত্রী বহনের সক্ষমতা এবং প্রায় ৮ হাজার ৬০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত উড়তে পারার কারণে উড়োজাহাজটি দূরবর্তী গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ বাড়াবে। সিডনি কিংবা ভবিষ্যতের নিউইয়র্ক রুটের মতো দীর্ঘপথের বাজারে এই সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দীর্ঘ সময় আকাশে থাকার উপযোগী আধুনিক প্রযুক্তি ও তুলনামূলক জ্বালানি দক্ষতার কারণে এ৩৫০ বিমানের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, ছয়টি এ৩২১নিও অপেক্ষাকৃত ছোট বাজারে সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ দেবে। দুই শ্রেণির বিন্যাসে ১৮০ থেকে ২২০ যাত্রী বহন করতে পারা এই উড়োজাহাজ দিয়ে যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী মাঝারি দূরত্বের রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
শুধু বহর নয়, বাড়বে রুটের শক্তি
বিমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রুট সম্প্রসারণে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট বাড়ানোর পাশাপাশি সিডনিতে নতুন করে ফ্লাইট চালু, জাপানে দ্বিতীয় ফ্লাইট এবং প্রয়োজনীয় অ্যাভিয়েশন অডিট সম্পন্ন হলে নিউইয়র্ক রুটে ফেরার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নতুন উড়োজাহাজ হাতে এলে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি হবে। যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন আকারের উড়োজাহাজ ব্যবহার করা যাবে। একই সঙ্গে বেশি চাহিদার রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়িয়ে বাজারের বড় অংশ ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থাৎ নতুন বহরের মূল শক্তি শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা নয়; একই বহরের মধ্যে বিভিন্ন সক্ষমতার উড়োজাহাজ থাকায় রুট পরিকল্পনায়ও বাড়বে নমনীয়তা।
বোয়িং-এয়ারবাসে ভারসাম্যের বহর
বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাস যুক্ত হওয়ায় বিমানের বহর আরও বৈচিত্র্যময় হবে। এর ফলে একটি নির্মাতার সরবরাহ বা অপারেশনাল সমস্যায় বিকল্প বহর ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। দীর্ঘমেয়াদি রুট পরিকল্পনাতেও বিভিন্ন মডেলের সক্ষমতা কাজে লাগানো যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈচিত্র্য যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী উড়োজাহাজ ব্যবহারের সুযোগ বাড়াবে। ফলে কোনো রুটে বড় উড়োজাহাজ, আবার অন্য রুটে তুলনামূলক ছোট উড়োজাহাজ ব্যবহার করে আসন সক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
সামনে দক্ষতার বড় সুযোগ
বড় বহর পরিচালনার সঙ্গে বাড়বে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। এ৩৫০-৯০০, এ৩২১নিও, ৭৮৭-৯, ৭৮৭-১০ ও ৭৩৭-৮—নতুন পাঁচ ধরনের মডেলের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তবে এটিকে কেবল ব্যয়ের চাপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নতুন উড়োজাহাজের সঙ্গে নতুন দক্ষতা, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো এবং প্রকৌশল সক্ষমতা গড়ে উঠলে বিমানের দীর্ঘমেয়াদি অপারেশনাল শক্তিও বাড়বে। অর্থাৎ বহর সম্প্রসারণ একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে।
যাত্রী আছে, এবার সেবার পালা
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমানের সাবেক পরিচালক কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, দেশে বিমানযাত্রীর অভাব নেই; প্রত্যাশিত সেবা না পাওয়ার কারণে অনেক যাত্রী বিদেশি এয়ারলাইন্সে চলে যাচ্ছেন। তাঁর মতে, নতুন উড়োজাহাজের পাশাপাশি দক্ষ জনবল, অবকাঠামো ও কার্যকর পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি।
এই জায়গাটিই বিমানের সামনে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে। দেশের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজার, প্রবাসী বাংলাদেশিদের বড় বাজার এবং নতুন নতুন গন্তব্যে সরাসরি যোগাযোগের চাহিদা কাজে লাগাতে পারলে নতুন বহর দ্রুতই ব্যবসায়িক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
বিনিয়োগ থেকে প্রবৃদ্ধির পথে
৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ মানে বড় বিনিয়োগ। সঙ্গে থাকবে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি রাজস্ব বাড়ানোরও বড় সুযোগ। সঠিক রুট নির্বাচন, যাত্রী চাহিদার সঙ্গে আসন সক্ষমতার সমন্বয়, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া এবং উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে পারলে নতুন বহর বিমানের আয় বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। বহর সম্প্রসারণ শুধু বিমানের আকারই বাড়াবে না—দেশের পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের জন্য খুলে দিতে পারে প্রবৃদ্ধির নতুন আকাশ।
কালের আলো/টিই/এমকে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ