যে হাত মাটিতে বীজ ছড়ায়, যে হাত ফসলের শীষে ভবিষ্যৎ খোঁজে—সেই হাতেই এবার উঠবে একটি কার্ড। শুধু পরিচয়ের জন্য নয়, সরকারি সহায়তার দরজা সরাসরি খুলে দিতে। কৃষকের ঘাম আর রাষ্ট্রের সহায়তার মাঝখানে যে দূরত্ব, সেই দূরত্ব কমানোর লক্ষ্যেই শুরু হচ্ছে ‘কৃষক কার্ড’।
- আগামীকাল ১ অক্টোবর ফুলগাজীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্বোধন
- প্রথম ধাপেই এক লাখ ১০ হাজার কৃষক, লক্ষ্য প্রকৃত কৃষককে রাষ্ট্রীয় সহায়তার কেন্দ্রে আনা
- কিউআর কোডে পরিচয়, ব্যাংকে প্রণোদনা, এক প্ল্যাটফর্মে কৃষকের তথ্য
আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ফেনীর ফুলগাজী থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। একটি কার্ডের যাত্রা শুরু হবে সেখান থেকে, যার পরিধি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে দেশের প্রত্যন্ত কৃষি ব্লক পর্যন্ত। প্রথম ধাপে ৫৬ জেলার ৭৭ উপজেলা ও ৭৭ কৃষি ব্লকের এক লাখের বেশি কৃষক যুক্ত হচ্ছেন। একই দিনে নির্বাচিত কৃষকের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি পৌঁছাবে প্রণোদনার অর্থ।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় কৃষক কার্ড বিতরণ উদ্বোধন করবেন। ৫৬ জেলার ৭৭ উপজেলা ও ৭৭ কৃষি ব্লকের এক লাখ ১০ হাজার ১৬৫ জন কৃষকের ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ ৪৭ জন কৃষকের কাছে সরাসরি প্রণোদনার টাকা দেওয়া হবে।’ সচিব জানান, ফেনীর ছয় উপজেলার প্রথম ব্যাচে ৭ হাজার ৬৪৩ জন কৃষকের কার্ড বিতরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ব্যাচে আরও এক লাখ ২ হাজার ৫২২ জন কৃষকের জন্য কার্ড বিতরণের প্রস্তুতিও শেষ।
একটি কার্ড, পেছনে বিশাল স্বপ্ন
দেখতে ছোট একটি কার্ড। কিন্তু এর ভেতরে রাখা হচ্ছে কৃষকের বড় একটি পরিচয়। কৃষকের নাম, জমির পরিমাণ, উৎপাদনের ধরন, নিবন্ধন, ব্যাংক হিসাব এবং সরকারি সহায়তা পাওয়ার তথ্য—ধীরে ধীরে সবকিছুকে একটি ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের কাছে শুধু ‘একজন কৃষক’ হিসেবে নয়, প্রত্যেক কৃষকের আলাদা একটি তথ্যভিত্তিক পরিচয় থাকবে। কোথায় কত কৃষক, কার জমি কত, কে কোন ফসল ফলান, কে কী সহায়তা পেয়েছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আর কাগজের স্তূপে হাতড়াতে হবে না।
প্রণোদনা যাবে কৃষকের হাত ঘুরে জমিতে
প্রাথমিকভাবে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বছরে একবার ২ হাজার ৫০০ টাকা করে প্রণোদনা দেওয়া হবে। তবে এই টাকা শুধু হাতে পৌঁছালেই দায়িত্ব শেষ হচ্ছে না। নির্ধারিত সার, বীজ, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণ কেনার জন্যই অর্থটি ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ কৃষকের হাতে যাওয়া টাকা আবার ফিরে যাবে জমিতে—বীজে, সারে, ফসলে। কৃষকের ঘামে যে উৎপাদন, সেই উৎপাদনের পেছনেই সরকারি সহায়তাকে বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা থাকছে। এক লাখ কৃষককে এই হারে প্রণোদনা দিতে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন হবে ২৫ কোটি টাকা।
কিউআর কোডে খুলবে কৃষকের পরিচয়
কার্ডের গায়ে থাকবে কিউআর কোড। একবার স্ক্যান করলেই উঠে আসবে নিবন্ধিত কৃষকের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য। প্রযুক্তির এই ছোট্ট সংযোজনটি বড় একটি কাজ করতে পারে। একই কৃষক একাধিকবার সুবিধা নিচ্ছেন কি না, তালিকায় ভুয়া নাম ঢুকেছে কি না কিংবা কোনো কৃষক আগে কী সহায়তা পেয়েছেন—এসব যাচাই সহজ হবে।
নির্ধারিত কৃষি উপকরণের দোকানেও বসানো হচ্ছে পয়েন্ট অব সেল বা পিওএস মেশিন। কার্ড দেখিয়ে কৃষক নির্ধারিত উপকরণ কিনতে পারবেন। ফলে প্রণোদনা দেওয়ার পর অর্থের গতিপথও নজরে রাখার সুযোগ থাকবে।
ব্যাংকের পথ পেরিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছে
কৃষকের ব্যাংক হিসাবও এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রণোদনার অর্থ লেনদেনে যুক্ত হয়েছে সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক। ইতোমধ্যে এক লাখ ১০ হাজার ১৬৫ জন কৃষকের ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। ফলে সরকারি অর্থ পৌঁছাবে সরাসরি কৃষকের হিসাবে। মাঝখানের অনাবশ্যক স্তর কমবে, অর্থের হিসাবও থাকবে স্পষ্ট।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কে প্রকৃত কৃষক? কৃষক কার্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি যেমন সঠিক তথ্য, সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও সেখানেই। জমির পরিমাণকে প্রাথমিক ভিত্তি ধরে কৃষক শনাক্ত করা হচ্ছে। পাঁচ শতাংশের কম জমির মালিককে ভূমিহীন, পাঁচ থেকে ৪৯ শতাংশকে প্রান্তিক এবং ৫০ থেকে ১৪৯ শতাংশ জমির মালিককে ক্ষুদ্র কৃষক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু গ্রামের কৃষি বাস্তবতা শুধু জমির দলিলে আটকে নেই। বর্গাচাষি আছেন, ভাগচাষি আছেন, অন্যের জমিতে ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলানো মানুষ আছেন। তাই কার্ডের তালিকায় প্রকৃত কৃষকের নাম তোলা এবং সেই তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখাই হবে কর্মসূচির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
এক লাখ থেকে দুই কোটি ৪০ লাখ
ফুলগাজীর প্রথম আয়োজনটি আসলে একটি দীর্ঘ যাত্রার শুরু। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
আর পাঁচ বছরের মধ্যে ৬৪ জেলার ৫০৩ উপজেলা ও ১৮ হাজার ১৮০ কৃষি ব্লকের প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ কৃষককে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ আজকের এক লাখ কৃষক আগামী দিনের বিশাল কৃষক ডেটাবেসের প্রথম সারির অংশ।
বদলাবে সহায়তার ভাষা
একজন কৃষকের জমি থেকে ব্যাংক হিসাব—সব তথ্য যখন একটি ব্যবস্থায় থাকবে, তখন কৃষি সহায়তার চেহারাও বদলাতে পারে। কৃষিঋণ, কৃষিবীমা, সেচ, সার-বীজ, কৃষিযন্ত্র কিংবা দুর্যোগের সময় জরুরি সহায়তা—সবকিছুই আরও নির্দিষ্ট কৃষকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুর রহিম জানিয়েছেন, ১ অক্টোবর ফেনীতে ৭ হাজার ৬৪৩ জন কৃষককে কার্ড দেওয়া হলেও পর্যায়ক্রমে তালিকাভুক্ত সব কৃষকই এই সুবিধার আওতায় আসবেন।
ফুলগাজীতে আজ ১ অক্টোবর তাই শুধু একটি কার্ড বিতরণের দিন নয়। মাটির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে আরও সরাসরি করার একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু। একটি কার্ড হয়তো ছোট। কিন্তু সেই কার্ডে লেখা থাকবে কৃষকের পরিচয়, জমির হিসাব, প্রাপ্য সহায়তা আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। মাটির মানুষের হাতে সেই কার্ড পৌঁছানোর মধ্য দিয়েই শুরু হচ্ছে কৃষিকে তথ্যের শক্তিতে এগিয়ে নেওয়ার নতুন যাত্রা।
কালের আলো/আরআই/এমকে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৩:৩২ অপরাহ্ণ