স্ত্রীর মৃত্যুর এক দিন পরই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাতে কুয়ালালামপুরের ন্যাশনাল হার্ট ইনস্টিটিউট (আইজেএন) হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তার কার্যালয় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
১০১ বছর বয়সী মাহাথিরকে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
‘গত দুই দিন তার জন্য বেশ কঠিন ছিল’
মাহাথিরের দীর্ঘদিনের সহকারী সুফি ইউসুফ এএফপিকে জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের কাছ থেকে তার শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
মাহাথিরের ছেলে মোখজানি বুধবার মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বারনামাকে বলেন, পর্যবেক্ষণের জন্য তার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গত দুই দিন মাহাথিরের জন্য বেশ কঠিন ছিল। তবে বর্তমানে তিনি ভালো আছেন এবং উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
এক দিন আগেই মারা যান স্ত্রী
মাহাথির হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঠিক এক দিন আগে মারা যান তার স্ত্রী সিতি হাসমাহ মোহাম্মদ আলী। ১০০ বছর বয়সী সিতি হাসমাহও কুয়ালালামপুরের ন্যাশনাল হার্ট ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তারা মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণভাবে পরিচিত ছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মাহাথিরকে নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছোট ভিডিওতে পাহাংয়ের সুলতান আবদুল্লাহ আহমদ শাহের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় মাহাথিরকে। সেখানে স্ত্রীর মৃত্যুতে নিজের কষ্ট ও অবিশ্বাসের কথা জানান তিনি।
মাহাথির বলেন, ‘আজ তাকে হারাব, তা আমি ভাবিনি।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার হাসপাতালে
বয়সজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে মাহাথিরকে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাড়িতে পড়ে গিয়ে তার ডান নিতম্বের হাড় ভেঙে যায়। এরপর প্রায় তিন সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। বয়সের কারণে চিকিৎসকেরা তার অস্ত্রোপচার না করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর থেকে হুইলচেয়ার ব্যবহার করছেন মাহাথির।
জুলাইয়ে নিজের ১০০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে প্রায় দুই সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগের সমস্যাতেও ভুগছেন মাহাথির। ১৯৮৯ ও ২০০৭ সালে তার দুটি বাইপাস অস্ত্রোপচার হয়েছিল।
মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘ প্রভাব
মাহাথির মোহাম্মদ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। তিনি ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রথম দফায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘ এই সময়ে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
তার সরকারের সময়ে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে মালয়েশিয়া শিল্প ও উৎপাদন খাতে আরও এগিয়ে যায়। দেশজুড়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, সড়ক নির্মাণ ও শিল্পায়নের বিস্তার ঘটে।
১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে এশিয়ার আর্থিক সংকটের সময় মাহাথিরের অর্থনৈতিক নীতিও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ গ্রহণের পরিবর্তে তিনি রিঙ্গিতের বিনিময় হার মার্কিন ডলারের সঙ্গে নির্দিষ্ট করে দেন।
তার সমর্থকদের মতে, এই নীতি মালয়েশিয়াকে আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করেছিল। তবে তার শাসনামল নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
বিতর্কও ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে
মাহাথিরের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনীতিক, কর্মী ও সমালোচকদের দমনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ১৯৮৭ সালের ‘অপারেশন লালাং’-এর সময় শতাধিক বিরোধী রাজনীতিক, কর্মী ও সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল। সমালোচকেরা ওই অভিযানকে সরকারের বিরোধীদের দমনের পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন।
তবে এসব বিতর্কের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক রূপান্তর ও দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দেশটির আধুনিক ইতিহাসে মাহাথির একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
স্ত্রী সিতি হাসমাহর মৃত্যুর পর শোকের মধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় ১০১ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কালের আলো/এসএ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ২:৫৪ অপরাহ্ণ