সাত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের শর্ত কাগজেই

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:৩৬ অপরাহ্ণ

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শর্ত ছিল স্পষ্ট—কতটুকু পড়াশোনা, কত বছরের অভিজ্ঞতা, কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিজ্ঞতা এবং সর্বোচ্চ বয়স কত। কিন্তু নিয়োগের সময় সেই শর্তেরই যেন ভিন্ন ব্যাখ্যা হয়েছে। কারও প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছিল না, কারও অভিজ্ঞতা ছিল নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কয়েক বছর কম, কেউ দেখিয়েছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি, কেউ আবার খণ্ডকালীন কাজকে অভিজ্ঞতা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কোথাও আবার নির্ধারিত বয়সসীমা পেরিয়েও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

  • অযোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি নিয়েই নিয়োগ
  • চাকরির সনদ, বয়সসীমা লঙ্ঘনের তথ্য অডিটে
  • সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও অর্থ আদায়ের সুপারিশ

সাত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন নিয়োগে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের বেতন-ভাতা হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৪ টাকা। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। অডিটের পর্যবেক্ষণ, বিজ্ঞপ্তির সুস্পষ্ট শর্ত লঙ্ঘনের দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।

অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগ, পরে পদোন্নতি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চমান সহকারী পদে ১৩টি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে স্নাতক ডিগ্রির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। অডিটে বলা হয়েছে, মো. শরিফুল আলম ও রাশেল আহমেদের সেই অভিজ্ঞতা ছিল না। এরপরও তারা নিয়োগ পান। বর্তমানে দুজনই সহকারী রেজিস্ট্রার। এই নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৩ লাখ ৬২ হাজার ১৪৪ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নিয়োগের সময় যোগ্যতা যাচাই না হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি কীভাবে উপেক্ষিত রইল।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে পাঁচ থেকে আট বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল। দিলীপ কুমার ঘোষ বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতার আট বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে নিয়োগ পান। কিন্তু তার জন্মতারিখ নিয়েও নথিতে অসঙ্গতি পাওয়া যায়। অডিটের মতে, নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেওয়ায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৬ লাখ ৭৯ হাজার ৯৬০ টাকা।

পাঁচ বছরের জায়গায় অভিজ্ঞতা দেড় বছর

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়মের চিত্র আরও বিস্তৃত। ফিজিক্যাল ইন্সট্রাকটর পদে মো. আসাদুজ্জামান নূর প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার সনদ দেখাতে পারেননি। অ্যাসিস্ট্যান্ট টেকনিক্যাল অফিসার পদে সৈয়দ তৌহিদুল হুদা রিমল দিয়েছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতার সনদ, যদিও বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, স্বায়ত্তশাসিত বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছিল।

সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে আবু মোহাম্মদ আরিফের অভিজ্ঞতা ছিল ১ বছর ৮ মাস ১৯ দিন; প্রয়োজন ছিল পাঁচ বছর। সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পাপিয়া সেনের অভিজ্ঞতা ১ বছর ৫ মাস ১৪ দিন, প্রয়োজন ছিল পাঁচ বছর।

সিনিয়র ভেটেরিনারি সার্জন পদে ডা. আদিত্য চৌধুরী অভি ও ডা. তারিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতাও ছিল ১ বছর ৫ মাস ১৪ দিন করে; বিজ্ঞপ্তিতে চাওয়া হয়েছিল পাঁচ থেকে ছয় বছর। এই ছয়জনের বেতন-ভাতা বাবদ দেওয়া হয়েছে ২১ লাখ ১২ হাজার ৭৬০ টাকা।

বয়সসীমারও তোয়াক্কা নেই

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেইল নার্স পদে মাহমুদুল হাসানের অভিজ্ঞতা ছিল এক বছর; বিজ্ঞপ্তিতে প্রয়োজন ছিল পাঁচ বছর। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) পদে এবিএম ইউসুফের বয়স বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দিন ছিল ৩২ বছর ৬ মাস ১৬ দিন। অডিটে এটিকে বয়সসীমা লঙ্ঘন বলা হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে নিয়োগ পাওয়া আরও ১২ জনের বয়সও ছিল ৩২ বছরের বেশি। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ দেওয়া হয়েছে ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৪০০ টাকা।

খণ্ডকালীন চাকরিও ‘অভিজ্ঞতা’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপারভাইজার পদে রাসেল আহমেদ ছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের খণ্ডকালীন শিক্ষক। মো. সোহেল রানা ছিলেন খণ্ডকালীন কর্মচারী। অডিটের ভাষ্য, এসব চাকরি স্থায়ী চাকরির অভিজ্ঞতা নির্দেশ করে না। এরপরও দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১১ লাখ ৫২ হাজার ৬৪০ টাকা। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার পদে নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রীর অভিজ্ঞতার সনদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অডিট। সনদটি সত্য নয় বলে প্রতীয়মান হওয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞপ্তির দিন তার বয়স ছিল ৩২ বছর ১ মাস ১৬ দিন।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মূল্য কোথায়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরীর প্রশ্ন, বিজ্ঞপ্তিতে যোগ্যতার শর্ত নির্ধারণের পর নিয়োগের সময় তা উপেক্ষা করা হলে বিজ্ঞপ্তির কার্যকারিতা কোথায়? তার মতে, নিয়োগ থেকে পদোন্নতি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঘটনাগুলো তাদের দায়িত্ব নেওয়ার আগের। তবে অনিয়মগুলো খতিয়ে দেখে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অডিটে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং আপত্তিকৃত অর্থ আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে। এখন সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের পাশাপাশি বড় প্রশ্ন—নিয়োগে যে শর্ত প্রতিযোগিতার ভিত্তি, সেটিই যদি নিয়োগের সময় অকার্যকর হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগব্যবস্থায় মেধা ও স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা কোথায়?

কালের আলো/এএএন/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন