হীরা দীর্ঘদিন ধরেই বিলাসিতা, সম্পদ ও আভিজাত্যের প্রতীক। বিয়ের আংটি থেকে শুরু করে দামি গহনা—বিশ্বজুড়ে এর চাহিদা ছিল উচ্চ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই বাজারেই বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রাকৃতিক হীরার দাম দ্রুত কমছে, আর একই সঙ্গে বাজারে বাড়ছে তুলনামূলক সস্তা ল্যাব-গ্রোন হীরার উপস্থিতি।
র্যাপাপোর্ট গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, এক ক্যারেট প্রাকৃতিক হীরার গড় দাম এখন প্রায় ৩ হাজার ৮৯৮ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ৪ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। অথচ ২০২১ সালে একই আকারের হীরার গড় দাম ছিল প্রায় ৮ হাজার ৭ ডলার বা ৯ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে দাম কমেছে প্রায় ৫১ শতাংশ।
ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে হীরার সূচক
প্রাকৃতিক হীরার দামের পতনের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ডায়মন্ড স্ট্যান্ডার্ড ইনডেক্সে। বিনিয়োগযোগ্য মানের হীরার দাম অনুসরণ করা এই সূচক গত আগস্টের শুরুতে নেমে আসে ২ হাজার ৪৯০-এ। এটি সূচকটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন অবস্থান।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হীরার দামে এই পতনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ। করোনাভাইরাস মহামারির সময় উৎপাদন বাড়ার পর ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বিপুল পরিমাণ অবিক্রীত হীরা জমে যায়।
ডায়মন্ড স্ট্যান্ডার্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা করম্যাক কিনির মতে, অতিরিক্ত মজুতের পাশাপাশি ল্যাবে তৈরি হীরার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিও প্রাকৃতিক হীরার বিক্রিতে প্রভাব ফেলেছে।
ফলে একদিকে বাজারে প্রাকৃতিক হীরার সরবরাহ বেড়েছে, অন্যদিকে ক্রেতাদের সামনে এসেছে কম দামের বিকল্প। এই দুই পরিস্থিতি একসঙ্গে প্রাকৃতিক হীরার দামের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
কেন এত জনপ্রিয় ল্যাব-গ্রোন হীরা?
ল্যাব-গ্রোন বা গবেষণাগারে তৈরি হীরা দেখতে অনেকটাই প্রাকৃতিক হীরার মতো। রাসায়নিক ও ভৌত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রেও দুটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। মূল পার্থক্য তাদের উৎপত্তিতে।
প্রাকৃতিক হীরা পৃথিবীর গভীরে দীর্ঘ সময় ধরে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। পরে খনি থেকে তা উত্তোলন করতে হয়। বিপরীতে ল্যাব-গ্রোন হীরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কার্বন বীজ বা কার্বনযুক্ত গ্যাস ব্যবহার করে তাপ ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তৈরি করা হয়।
এ কারণে ল্যাব-গ্রোন হীরা উৎপাদনে খনন, জ্বালানি ও শ্রমের খরচ তুলনামূলকভাবে কম পড়ে। আর সেই খরচের পার্থ্যক্য শেষ পর্যন্ত বাজারদরেও বড় ব্যবধান তৈরি করছে।
একই মানে দামের আকাশ-পাতাল পার্থক্য
একই ধরনের বৈশিষ্ট্যের প্রাকৃতিক ও ল্যাব-গ্রোন হীরার মধ্যে দামের পার্থক্য এখন অনেক বেশি। ব্রিলিয়ান্ট আর্থের বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় বর্ণহীন ও সামান্য ত্রুটিযুক্ত এক ক্যারেট ল্যাব-গ্রোন হীরার দাম প্রায় ৪৫০ ডলার বা ৫৫ হাজার ৩০০ টাকা হতে পারে।
অন্যদিকে একই বৈশিষ্ট্যের প্রাকৃতিক হীরার দাম হতে পারে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার থেকে ৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।
অবশ্য হীরার দাম নির্ধারণে আকার, কাট, রং ও স্বচ্ছতার মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে ল্যাব-গ্রোন হীরার দাম প্রাকৃতিক হীরার তুলনায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে।
বিয়ের আংটিতেও বদলাচ্ছে ক্রেতাদের পছন্দ
দামের এই বিশাল ব্যবধান ক্রেতাদের পছন্দেও পরিবর্তন আনছে। দ্য নটের ২০২৬ রিয়েল ওয়েডিংস স্টাডি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিক্রি হওয়া বাগদানের আংটির ৬১ শতাংশে কেন্দ্রীয় পাথর হিসেবে ল্যাব-গ্রোন হীরা ব্যবহার করা হয়েছে।
২০২০ সালের তুলনায় এই হার বেড়েছে ২৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বিয়ের গহনায় ল্যাব-গ্রোন হীরার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর একটি বড় কারণ হলো একই বাজেটে ক্রেতারা তুলনামূলক বড় আকারের হীরা কিনতে পারছেন। ফলে প্রাকৃতিক হীরার ওপর নির্ভরতা কমছে এবং ল্যাব-গ্রোন হীরা অনেক ক্রেতার কাছে বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠছে।
বাড়ছে ল্যাব-গ্রোন হীরার বাজার
শুধু বিয়ের গহনাতেই নয়, সামগ্রিকভাবেই ল্যাব-গ্রোন হীরার বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই বাজারের আকার ছিল প্রায় ২৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালে তা বেড়ে প্রায় ৯২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বাজার বড় হলে প্রাকৃতিক হীরার সঙ্গে প্রতিযোগিতাও আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে দাম, সহজলভ্যতা ও ক্রেতাদের পরিবর্তিত পছন্দের কারণে ভবিষ্যতে ল্যাব-গ্রোন হীরার প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
সরবরাহ কমানোর পথে খনি কোম্পানিগুলো
প্রাকৃতিক হীরার দাম ধরে রাখতে খনি কোম্পানিগুলোও সরবরাহ কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। ডি বিয়ার্স গ্রুপ জুলাইয়ে জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার ভেনেশিয়া খনিতে দুই বছরের বেশি সময় উৎপাদন বন্ধ রাখা হবে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালে অন্তত দুটি হীরার খনি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, খনি বন্ধ হলে প্রাকৃতিক হীরার সরবরাহ কমবে। সরবরাহ কমলে বাজারে দাম কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ল্যাব-গ্রোন হীরার উৎপাদন ও ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, তাতে প্রাকৃতিক হীরার দামের পুনরুদ্ধার কতটা স্থায়ী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
হীরা কি বিনিয়োগের সম্পদ?
হীরার দামের পতনের সঙ্গে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে—এটি আদৌ কতটা কার্যকর বিনিয়োগ সম্পদ? বিশ্লেষকদের মতে, হীরাকে বিনিয়োগ হিসেবে মূল্যায়ন করা তুলনামূলক কঠিন।
কারণ প্রতিটি হীরার আকার, রং, কাট ও স্বচ্ছতা আলাদা। ফলে সোনার মতো হীরার কোনো একক নির্ধারিত স্পট প্রাইস নেই। একই সঙ্গে এর পুনর্বিক্রয় বাজারও তুলনামূলক দুর্বল।
২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হীরার মান ও বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভর করে দ্বিতীয় বাজারে একটি পাথর বিক্রি হতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই খুচরা দামের অর্ধেকেরও কম দামে তা বিক্রি করতে হয়।
নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সিভিত্তিক ক্যাসেল জুয়েলার্সের মালিক কোরি শিফটারও হীরা কেনার ক্ষেত্রে এটিকে আর্থিক বিনিয়োগ হিসেবে না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, হীরা কেনার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ব্যবহার বা ব্যক্তিগত পছন্দ, বিনিয়োগ নয়।
সামনে কোন পথে যাবে হীরার বাজার?
প্রাকৃতিক হীরার বাজার এখন দুটি বিপরীত প্রবণতার মুখোমুখি। একদিকে খনি বন্ধ করে সরবরাহ কমানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ল্যাব-গ্রোন হীরার উৎপাদন ও ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক হীরার দাম আবার আগের পর্যায়ে ফিরবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে বাজারের পরিবর্তন শুধু দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বদলে যাচ্ছে ক্রেতাদের চিন্তাভাবনাও।
একসময় বিরলতা ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্য ধরে রাখার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হীরা এখন তুলনামূলক কম দামের ল্যাব-গ্রোন বিকল্পের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় পড়েছে। ফলে ভবিষ্যতের হীরার বাজারে প্রাকৃতিক ও ল্যাব-গ্রোন—দুই ধরনের হীরার অবস্থানই নতুন করে নির্ধারিত হতে পারে।
সূত্র: সিএনবিসি
কালের আলো/এসএ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:৫২ অপরাহ্ণ