বিয়ের পরও মায়ের কথাতেই চলেন? যে কারণে জটিলতা

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬ । ৮:৩৯ অপরাহ্ণ

মায়ের সঙ্গে ছেলের গভীর বন্ধনকে সাধারণত ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবেই দেখা হয়। ছেলে অসুস্থ হলে মায়ের দুশ্চিন্তা, পছন্দের খাবার রান্না করে দেওয়া কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাশে থাকা—এসবই পারিবারিক সম্পর্কের পরিচিত চিত্র। কিন্তু কখনও কখনও এই ঘনিষ্ঠতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের ব্যক্তিগত জীবনেও মায়ের প্রভাব অত্যন্ত বেশি হয়ে ওঠে।

বিয়ের পরও যদি কোনো ছেলে জীবনের ছোট-বড় প্রায় সব সিদ্ধান্তে মায়ের মতামতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেন, তখনই সামনে আসে পরিচিত শব্দ—‘মামাস বয়’। মায়ের সঙ্গে ছেলের গভীর সম্পর্ক থাকা নিজে কোনো সমস্যা নয়। বরং অনেক পরিবারের ক্ষেত্রেই এই বন্ধন আবেগ ও নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। জটিলতা তৈরি হতে পারে তখনই, যখন ভালোবাসা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম করে অন্যের জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মামাস বয়’ নিয়ে আলোচনা তাই শুধু ঠাট্টা বা মজার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, দাম্পত্য এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একজন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জীবনে মায়ের ভূমিকা ঠিক কতটা হওয়া উচিত?

সীমারেখা মানে দূরত্ব নয়

আমাদের সমাজে পরিবার শুধু সম্পর্কের জায়গা নয়, নিরাপত্তা ও আবেগেরও প্রধান আশ্রয়। সন্তান বড় হয়ে গেলেও তার খাওয়া, পোশাক, চাকরি, কোথায় থাকবে কিংবা কাকে বিয়ে করবে—এসব বিষয়ে মায়ের আগ্রহ থাকা অনেক পরিবারের কাছেই স্বাভাবিক। অনেকের কাছে এটিই মাতৃস্নেহের প্রকাশ।

তবে সমস্যা শুরু হতে পারে তখন, যখন ‘ভালো চাওয়া’ আর ‘সবকিছু ঠিক করে দেওয়া’র মধ্যে পার্থক্যটি হারিয়ে যায়। মনস্তত্ত্বে ‘এনমেশমেন্ট’ বলতে এমন এক ধরনের সম্পর্ককে বোঝানো হয়, যেখানে ব্যক্তিগত ও আবেগগত সীমারেখা স্পষ্ট থাকে না। কে কোথায় নিজের সিদ্ধান্ত নেবেন এবং কার অনুভূতির দায়িত্ব কার—এসব আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

মা-ছেলের সম্পর্কেও যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও নিজের জীবন নিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন।

বিয়ের পর বদলে যায় সম্পর্কের সমীকরণ

বিয়ের পর একজন ছেলে শুধু কারও সন্তান নন, তিনি একজন স্বামীও। ফলে তার জীবনে নতুন একটি সম্পর্ক ও সেই সম্পর্কের নিজস্ব পরিসর তৈরি হয়। কিন্তু পুরোনো সম্পর্কের অভ্যাস যদি আগের মতোই থেকে যায়, তখন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত আলোচনা, মনোমালিন্য কিংবা সংসারের সিদ্ধান্ত যদি নিয়মিতভাবে মায়ের কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে দাম্পত্যের নিজস্ব গোপনীয়তা কতটা বজায় থাকে—সেই প্রশ্ন সামনে আসে। প্রতিটি দাম্পত্যেরই কিছু বিষয় একান্ত নিজস্ব। সেসব বিষয়ে তৃতীয় একজন ব্যক্তি নিয়মিতভাবে যুক্ত হলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অস্বস্তি বা দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

ধীরে ধীরে এমন অনুভূতিও তৈরি হতে পারে যে, নিজেদের সম্পর্কের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কমে যাচ্ছে।

মায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেও তৈরি হতে পারে চাপ

এ ধরনের পরিস্থিতিতে আরেকটি জটিলতা তৈরি হতে পারে অপরাধবোধ থেকে। স্ত্রীকে সমর্থন করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে একজন ছেলে মনে করতে পারেন, এতে তার মা কষ্ট পাবেন। আবার মায়ের মতামতকে গুরুত্ব দিলে স্ত্রী কষ্ট পেতে পারেন।

ফলে দুই পক্ষকে সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে ওই ব্যক্তির ওপর মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে মা, ছেলে ও স্ত্রীর সম্পর্কেও টানাপোড়েন বাড়তে পারে।

শুরু হতে পারে অঘোষিত প্রতিযোগিতা

অনেক ক্ষেত্রে মা ও স্ত্রীর মধ্যে সরাসরি কোনো প্রতিযোগিতা থাকে না। কিন্তু কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কার কথা আগে শোনা হবে কিংবা কার জন্য বেশি সময় দেওয়া হবে—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে অঘোষিত মানসিক টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।

তখন ছোট কোনো ঘটনাও বড় ভুল বোঝাবুঝির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অথচ অনেক সময় সমস্যাটির মূল কারণ প্রতিযোগিতা নয়, বরং সম্পর্কের সীমানা স্পষ্ট না থাকা।

সুস্থ সীমারেখা কেমন হতে পারে?

সীমারেখা মানেই মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং সম্পর্ককে আরও স্বস্তিদায়ক রাখতে কোথায় থামতে হবে, সেটি বোঝা। একজন ছেলে মাকে ভালোবাসবেন, তার খোঁজ নেবেন, সম্মান করবেন—এটি স্বাভাবিক। একই সঙ্গে নিজের সংসার, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত জীবনের দায়িত্বও নিজেকেই নিতে হবে।

মায়ের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। তবে নিজের জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিজের প্রয়োজন, পরিস্থিতি ও দায়িত্ব বিবেচনা করেই নেওয়া জরুরি। এতে মায়ের প্রতি ভালোবাসা বা সম্মান কমে যায় না; বরং সম্পর্কের জায়গাগুলো আরও পরিষ্কার হয়।

অন্যদিকে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে মায়ের ভূমিকাতেও পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। সন্তানের প্রতিটি সিদ্ধান্তে জড়িয়ে থাকার পরিবর্তে তাকে নিজের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া সম্পর্কটিকে আরও পরিণত করতে পারে। নিজের শখ, বন্ধুত্ব ও সামাজিক জীবন নিয়েও ব্যস্ত থাকা সম্ভব।

স্ত্রীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

এক্ষেত্রে স্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী ও তার মায়ের বহু বছরের সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বরং পারস্পরিক সম্মান এবং স্পষ্ট সীমারেখা বজায় রাখাই সম্পর্কগুলোকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হতে পারে।

মায়ের সঙ্গে ছেলের সম্পর্ক যেমন সম্মানের, তেমনি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেরও নিজস্ব জায়গা রয়েছে। একটি সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে গিয়ে অন্য সম্পর্কের ব্যক্তিগত পরিসর যেন নষ্ট না হয়—সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত মায়ের ভালোবাসা যত গভীরই হোক, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জীবনে ভালোবাসার পাশাপাশি স্বাধীনতার জায়গাটিও থাকা জরুরি। সুস্থ সম্পর্কের অর্থ সব সিদ্ধান্ত একজনের হাতে থাকা নয়; বরং প্রত্যেকে ভালোবাসা, সম্মান এবং একে অপরের ব্যক্তিগত পরিসরকে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ পাওয়া।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, মিডিয়াম

কালের আলো/এসএ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন