ভাঙচুরের ক্ষত পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:১৩ অপরাহ্ণ

মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কয়েক দিন আগেও ছিল ভাঙচুরের ক্ষতচিহ্ন। এখন সেখানে দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেয়ালে নতুন ইটের গাঁথুনি, প্লাস্টার ও রং; বসানো হচ্ছে দরজা-জানালা ও লোহার গ্রিল। পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে, শৌচাগারগুলোও ব্যবহার উপযোগী করার কাজ চলছে। অর্থাৎ হামলার ধাক্কা সামলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধীরে ধীরে তার অবকাঠামোগত রূপ ফিরে পাচ্ছে।

তবে এই পুনরুদ্ধারের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ভবন নয়, সেবা। হামলার আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ মানুষ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিতেন, এখন সেখানে সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হচ্ছে। টিনের ছাউনির নিচে শিশুদের টিকা এবং নারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চালু রয়েছে। এই সীমিত কার্যক্রমই দেখাচ্ছে—পুরো অবকাঠামো প্রস্তুত না হলেও সেবা বন্ধ না রাখার চেষ্টা চলছে।

  • দ্রুত সংস্কারে বদলেছে দৃশ্যপট
  • টিকা ও নারীস্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত
  • পূর্ণ কার্যক্রম ফেরাতে নজর চিকিৎসা সরঞ্জামে

সংস্কারের গতি: ক্ষত সারছে দ্রুত

গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামনের ও পেছনের বারান্দার দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও টিকা লুটের পাশাপাশি ভবনের কিছু অংশ ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

এরপর শুরু হয় পুনর্গঠন। বর্তমানে দেয়াল মেরামত, প্লাস্টার ও রঙের কাজ এগিয়ে চলছে। নতুন দরজা-জানালা ও গ্রিল বসানোর কাজও শেষ হয়েছে। প্রশাসনিক ভবন, কর্মীদের বসার জায়গা এবং খাবার কক্ষেও সংস্কার হচ্ছে। পেছনের সীমানাদেয়ালের কাজ শেষ করে এখন রঙের প্রস্তুতি চলছে। এই অগ্রগতির একটি তাৎপর্য রয়েছে। হামলার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন হয়ে থাকেনি; দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগের কারণে সেটি আবার একটি সচল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ফেরার প্রক্রিয়ায় ঢুকেছে।

৫৬ জনের সেবা: ছোট পরিসরে বড় বার্তা

সংস্কার চললেও স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গত শনিবার (০৩ অক্টোবর) ৫৬ জন সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫ শিশু টিকা পেয়েছে এবং ২১ নারী স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন। সংখ্যাটি আগের দৈনিক গড় ৪০০ রোগীর তুলনায় অনেক কম। কিন্তু এটিকে কেবল ঘাটতির হিসাব হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। ভবনের কাজ চলার মধ্যেও টিকাদান ও নারীস্বাস্থ্যসেবা চালু রাখা হয়েছে। অর্থাৎ পুনর্গঠনের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় সেবাগুলো ধরে রাখার একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। বিশেষ করে টিকাদান কার্যক্রম চালু থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ টিকা নির্ধারিত সময়ে না পেলে শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হতে পারে। একইভাবে নারীদের প্রাথমিক সেবা চালু থাকায় পুরো কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েনি।

ভবন প্রস্তুত হলেই যে সেবা প্রস্তুত—তা নয়

রাড্ডার পুনর্গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় এখন সামনে। ভবনের কাঠামোগত কাজ দ্রুত শেষ করা গেলেও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা চালুর জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কার্যকর কর্মপরিবেশ।

হামলায় দুটি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন, কালার প্রিন্টার, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, জেনারেটর এবং তিনটি বড় এসি লুট হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা সেবার উপকরণ, বিশেষ বিছানা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও অটোক্লেভ মেশিনও ক্ষতিগ্রস্ত বা লুট হয়েছে। চিকিৎসকদের বসার ব্যবস্থা, টেবিল, চেয়ার, ফাইল ক্যাবিনেট, স্টিলের আলমারি ও ওষুধ সংরক্ষণের আসবাবও ক্ষতির তালিকায় রয়েছে। তাই পুনরুদ্ধারের দ্বিতীয় ধাপটি হবে ‘সরঞ্জাম পুনঃস্থাপন’। কোন সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে, কোনটি ব্যবহারযোগ্য এবং কোনটি নতুন করে সংগ্রহ করতে হবে—এটি নির্ধারণ করা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি।

উদ্ধার হওয়া দুই ট্রাক সামগ্রী

লুট হওয়া দুই ট্রাক পণ্য উদ্ধার করে পুলিশ প্রশাসনের জিম্মায় রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় সেগুলো স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। এখানেই পুনর্গঠনের একটি সম্ভাবনাময় দিক তৈরি হয়েছে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে যদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসা উপকরণ থাকে, তাহলে নতুন করে সংগ্রহের চাপ কিছুটা কমতে পারে। আবার কী কী সামগ্রী নেই, সেটিও দ্রুত নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ উদ্ধার হওয়া পণ্য শুধু হারানো সম্পদ ফেরত পাওয়ার বিষয় নয়; এটি পূর্ণাঙ্গ সেবা চালুর প্রয়োজনীয়তা নিরূপণের ভিত্তিও তৈরি করতে পারে।

সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে পুনর্গঠনের সুযোগ

স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সেবা চালুর বিষয়ে রাড্ডা ট্রাস্টের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিবার পরিকল্পনা সেবার চিকিৎসা উপকরণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এবং টিকা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে পাওয়ার কথা রয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের জন্য সরকারের সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা চলছে।

এখানে একটি সমন্বিত পুনর্গঠন কাঠামোর সুযোগ রয়েছে। ভবনের সংস্কার এক পক্ষ করছে, টিকা ও পরিবার পরিকল্পনা উপকরণ আসছে সরকারি ব্যবস্থাপনায়, আর কেন্দ্রের নিজস্ব কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তালিকা প্রস্তুত করছে। এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে এগোলে পুনরুদ্ধারের সময় কমানো সম্ভব হতে পারে।

বৃহস্পতিবারের মধ্যে কাঠামো

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের অর্থায়নে চলা সংস্কারকাজ আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে শেষ করে কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এটি পূরণ হলে পুনর্গঠনের একটি দৃশ্যমান ধাপ শেষ হবে। কিন্তু প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হবে অন্য জায়গায়—কত দ্রুত আগের সেবার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা যায়। শুধু রঙ করা দেয়াল বা নতুন দরজা-জানালা দিয়ে সেই লক্ষ্য পূরণ হবে না। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কক্ষ, আসবাব ও সেবা-ব্যবস্থা প্রস্তুত করতে হবে।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্তমান অগ্রগতি তাই একটি পুনর্গঠনের মাঝপথের ছবি। ভাঙচুরের ক্ষত দ্রুত মেরামত হচ্ছে, সীমিত সেবা চালু রয়েছে, উদ্ধার হওয়া সামগ্রী ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ নিয়েও আলোচনা চলছে। এখন এসব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনায় এনে দ্রুত বাস্তবায়ন করাই হবে পরবর্তী বড় পদক্ষেপ।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন