একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে হোয়াইট হাউস থেকে। একই ছবি পরে শেয়ার করেছে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস। অথচ সেই ছবিকেই ‘ভুয়া’ প্রমাণের ঘৃণ্য কসরত চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আর এই দাবির পক্ষে যে ছবি ঘুরছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের দাবি—সেটিই এআই-জেনারেটেড বা ম্যানিপুলেটেড। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের ছবি ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক তাই এখন শুধু একটি ছবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি উৎসে প্রকাশিত একটি ছবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ব্যবহৃত বিকল্প ‘প্রমাণ’ কতটা সত্য?
- সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্যের তাণ্ডব
- হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত ছবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ
- মাহ্দী আমিনের কড়া অবস্থান
প্রথম প্রশ্ন: ছবিটির উৎস কোথায়?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়া বিশ্বনেতা ও তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে অভ্যর্থনা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের উপস্থিতির ছবিটি পরে হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশ করা হয়। এখানে সরকারের যুক্তির জায়গাটি স্পষ্ট। ছবিটি কোনো অজ্ঞাত ব্যক্তি বা রাজনৈতিক কর্মীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথমে ছড়ানো হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ছবিটি এসেছে খোদ হোয়াইট হাউস থেকে।
এরপর ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসও সেটি প্রকাশ করেছে। অতএব, ছবিটির সত্যতা যাচাইয়ের প্রথম ধাপেই সরকারি উৎসের বিষয়টি সামনে আসে। কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত ছবিকে একই মাত্রায় বিবেচনা করার সুযোগ নেই—সরকারের বক্তব্যের মূল যুক্তি এটিই।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: ‘ভুয়া’র প্রমাণটি কি সত্য?
বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এখানেই। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, তারেক রহমানের প্রকাশিত ছবিটিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিকল্প ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে। ছবিটিতে ট্রাম্পের সঙ্গে কসোভোর প্রধানমন্ত্রী আলবিন কুর্তির দৃশ্যকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রেস উইংয়ের দাবি, আলবেনিয়াভিত্তিক সংবাদ ও বিশ্লেষণধর্মী প্ল্যাটফর্ম Pamfleti.net-এর ২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে ওই ছবিটিকে এআই-জেনারেটেড বা ম্যানিপুলেটেড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
অর্থাৎ সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, যে ছবি দিয়ে হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত ছবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, সেটির নিজেরই বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এখানেই অপপ্রচারের কৌশলটি ধরা পড়ে—একটি সন্দেহজনক বা কৃত্রিম কনটেন্টকে ‘প্রমাণ’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে আসল উৎসের ছবিকে সন্দেহের মধ্যে ফেলা।
মাহ্দী আমিনের সরাসরি প্রশ্ন
রোববার (০৪ অক্টোবর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনও বিষয়টি নিয়ে সরাসরি অবস্থান নেন। তাঁর বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক, শেয়ার, কমেন্ট ও ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা অনেক সময় তথ্য যাচাইয়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত একটি ছবি পরে মার্কিন দূতাবাসও শেয়ার করার পরও সেটি নিয়ে কেন এমন প্রশ্ন তৈরি করা হচ্ছে?
মাহ্দী আমিনের যুক্তি আরও সরল—বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, সেটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তাঁর দাবি, দুই নেতার মধ্যে আন্তরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনা হয়েছে। সুতরাং ঘটনাটিকে অবিশ্বাস্য করে তোলার চেষ্টা করার পেছনে বাস্তব কোনো যুক্তি নেই।
একই বয়ানে পরিবারের সদস্যরাও
তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে ঘিরেও ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন মাহ্দী আমিন। বিশেষ করে জাইমা রহমানের জাতিসংঘে চাকরির বিষয়ে তাঁর বক্তব্য—যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতেই তিনি চাকরি পেয়েছেন; এর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। এতে সরকারের অভিযোগের পরিধি আরও স্পষ্ট হয়। তাদের দাবি, বিচ্ছিন্ন কোনো ভুল নয়; রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে ধারাবাহিকভাবে এমন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
এআইয়ের যুগে ‘চোখে দেখা’ই শেষ কথা নয়
এসব বিতর্কের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রযুক্তিগত। এআই এখন এমন ছবি তৈরি করতে পারে, যা প্রথম দেখায় বাস্তব বলে মনে হতে পারে। ফলে কোনো ছবি সত্য কি না, তা শুধু চোখে দেখে কিংবা ভাইরাল হওয়ার মাত্রা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। এই জায়গায় সরকারের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সুস্পষ্ট: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি নয়, ছবির উৎসকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে সরকারের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো—ছবিটি হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত এবং পরে মার্কিন দূতাবাসও তা শেয়ার করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তারেক রহমানের ছবিকে ঘিরে তাই লড়াইটি কেবল একটি ছবির সত্য-মিথ্যা নিয়ে নয়। এটি তথ্যের উৎস বনাম ভাইরাল দাবির লড়াই। আর সরকারের বার্তাটি পরিষ্কার—রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু একটি সরকারি অনুষ্ঠানের ছবি নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে হবে যাচাইযোগ্য উৎস ও প্রমাণের ভিত্তিতে; এআই-নির্ভর বিভ্রান্তির ওপর নয়।
কালের আলো/এমএএএমকে

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:৩১ অপরাহ্ণ