ওয়েজবোর্ডের জট খুলতে সরকারের নতুন উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের জট খুলতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। সাংবাদিকদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি প্রয়োজনে মন্ত্রিসভায় উত্থাপনেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, কল্যাণ, সাংবাদিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা—এসব ইস্যুতেও সরকার ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।

রোববার (০৪ অক্টোবর) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

  • নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের পাশাপাশি দশম বোর্ডের দাবিও বিবেচনায়
  • প্রয়োজন হলে মন্ত্রিসভায় তোলার কথা জানালেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী

ওয়েজবোর্ডে দীর্ঘ অচলাবস্থা, সামনে দশম বোর্ডের দাবি

সাংবাদিকদের বেতন-কাঠামো ও পেশাগত অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পায়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওয়েজবোর্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অচলাবস্থা চলছে। নবম ওয়েজবোর্ড যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। দশম ওয়েজবোর্ডের বিষয়ে সাংবাদিকদের দাবির পাশাপাশি নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় শ্রম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করছে। এই উদ্যোগ আরও জোরদার করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সাংবাদিকদের স্বার্থে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে এবং প্রয়োজনে মন্ত্রিসভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।

ডিইউজে নেতারাও ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের বিষয়টিকে সাংবাদিকদের অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে তুলে ধরেন। সংগঠনটির সভাপতি মোঃ শহীদুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকরা দিনরাত পরিশ্রম করে জনগণের সামনে দেশের খবর তুলে ধরেন। অনেক সময় তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দায়িত্ব পালন করেন। অথচ তারা ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ডিইউজের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ দিদারুল আলম দিদার বলেন, দীর্ঘদিন ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন না হওয়ায় সাংবাদিকরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি অবিলম্বে দশম ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করার দাবি জানান। ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করে না এমন পত্রিকা ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে সরকারি বিজ্ঞাপন এবং ক্রোড়পত্র না দেওয়ার বিষয়ে সরকারের কঠোর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।

শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নেও মালিকদের দায়

সাংবাদিকদের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কেবল সরকারি সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়—গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষকেও দায়িত্বশীল হতে হবে বলে মনে করেন প্রতিমন্ত্রী।

ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা জরুরি। সাংবাদিকরা জনগণের কাছে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে ভালো সাংবাদিকরা কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন এবং নতুন ভালো সাংবাদিক তৈরি হবে না।

তিনি বলেন, মিডিয়া হাউজের মালিকদেরও সাংবাদিকদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। সরকার কোনো ঘোষণা দিলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা বাস্তবায়ন না করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।

অর্থাৎ, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের প্রশ্নটি শুধু সরকারি প্রজ্ঞাপন বা নীতিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি—বৈঠকের আলোচনায় বিষয়টি সেই দিকেই ইঙ্গিত করেছে।

‘কে সাংবাদিক’—সংজ্ঞা নির্ধারণে সংগঠনগুলোর প্রস্তাব চাইল সরকার

বৈঠকে সাংবাদিকতার পরিচয় ও পেশাগত স্বীকৃতির বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করে আসা পেশাদার সাংবাদিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া ভুয়া সাংবাদিকদের কারণে প্রকৃত সাংবাদিকরা যেমন হুমকির মুখে পড়ছেন, তেমনি জনগণ ও গণতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

কারা সাংবাদিক হিসেবে বিবেচিত হবেন, সে বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলমও এ বিষয়ে অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া উচিত নয়। ফেসবুক পেজ খুলে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের কল্যাণে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ কামনা করেন।

ফলে সাংবাদিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রশ্নটি এখন শুধু পেশাগত পরিচয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, সাংবাদিকদের মর্যাদা এবং জনসাধারণের কাছে গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও।

সাইবার নিরাপত্তা আইন: নিয়ন্ত্রণ নয়, নিরাপত্তার দাবি সরকারের

সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়েও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগ ও সরকারের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এই আইন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা সাংবাদিকদের লেখালেখি বন্ধ করার জন্য করা হচ্ছে না। জনগণকে নিরাপদ রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে হয়রানি, অসত্য তথ্য ও অপতথ্য ছড়িয়ে মানুষকে ক্ষতির মুখে ফেলার ঘটনা মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকের প্রকাশিত কোনো সংবাদ ভুলবশত আইনের ব্যত্যয় ঘটালে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার যে প্রস্তাব সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এসেছে, সরকার তা বিবেচনা করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় শব্দচয়ন ও বিধান কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়: প্রতিমন্ত্রী

সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। গণমাধ্যম কীভাবে চলবে সে বিষয়ে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

এই অবস্থানের সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও অধিকারকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখার প্রয়োজনীয়তাও বৈঠকে উঠে আসে। একদিকে যেমন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে, অন্যদিকে সাংবাদিকতার নামে অপতথ্য, হয়রানি ও ভুয়া পরিচয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় এসেছে।

লিখিত দাবি দিতে বললেন প্রতিমন্ত্রী

সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবি-দাওয়াগুলো লিখিতভাবে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, লিখিত প্রস্তাব পেলে সেগুলো বাস্তবায়ন ও পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণে সরকারের জন্য সুবিধা হবে।

একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে এ ধরনের মতবিনিময় অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সভায় ডিইউজের সহ-সভাপতি রাশেদুল হক, দপ্তর সম্পাদক ইকবাল মজুমদার তৌহিদ, কল্যাণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন রাজ্জাক, প্রচার সম্পাদক আবুল কালাম, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক রফিক লিটন, নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ গাজী আনোয়ার, তালুকদার এ এইচ এম নুরুল মোমেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

এসময় উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সহ-সভাপতি রফিক মোহাম্মদ, নির্বাহী সদস্য এম. মোশররফ হোসাইন, আবদুল্লাহ মজুমদার, ফখরুল ইসলামসহ অন্যরা।

সভায় সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, কল্যাণ, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন, সাংবাদিকদের সংজ্ঞা নির্ধারণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

কালের আলো/এমএএএমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন