বাংলাদেশের আকাশপথে নতুন যুগের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। দীর্ঘদিনের বোয়িংনির্ভর বহরে এবার বড় পরিসরে যুক্ত হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের উড়োজাহাজ। চারটি এ৩৫০-৯০০ ও ছয়টি এ৩২১নিও—মোট ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি আগামীকাল বুধবার (০৭ অক্টোবর) সই হওয়ার কথা। এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বোয়িং ও এয়ারবাস মিলিয়ে বিমানের নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের পাইপলাইনে থাকবে ৩৫টি উড়োজাহাজ। বহর সম্প্রসারণের এই উদ্যোগকে শুধু উড়োজাহাজ কেনার কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের নিজস্ব এয়ারলাইনসকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও শক্ত অবস্থানে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
- ৭ অক্টোবর ১০ উড়োজাহাজের চুক্তি
- ৩৫ নতুন উড়োজাহাজে আধুনিক হচ্ছে বিমানের বহর
- আন্তর্জাতিক রুট ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ
নতুন পরিকল্পনায় বিমানের জন্য নির্ধারিত ৩৫টি উড়োজাহাজের মধ্যে ২৫টি বোয়িং ও ১০টি এয়ারবাস। এর মধ্যে ১৯টি হবে ওয়াইডবডি এবং ১৬টি ন্যারোবডি। ফলে দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুট থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের গন্তব্য—বিভিন্ন ধরনের রুটে প্রয়োজন অনুযায়ী উড়োজাহাজ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে ৭৮৭-১০, ৭৮৭-৯ ও ৭৩৭-৮ মডেল। আগে ১৪টি বোয়িং কেনার জন্য প্রায় ৩৭০ কোটি ডলারের একটি প্যাকেজে সম্মতি দেওয়া হয়েছিল। পরে আরও ১১টি বোয়িং কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর ফলে বিমানের বহর আধুনিকায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রুট সম্প্রসারণের জন্যও একটি বড় ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।
এয়ারবাসে খুলবে নতুন সম্ভাবনা
এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজের সংযোজন বিমানের বহরে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে। এ৩৫০-৯০০ দীর্ঘপাল্লার রুটে ব্যবহারের মাধ্যমে দূরবর্তী আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। আর এ৩২১নিও তুলনামূলক ছোট ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহারের সুযোগ দেবে। এর ফলে যাত্রী চাহিদা ও রুটের দূরত্ব অনুযায়ী উড়োজাহাজ নির্বাচন করা সহজ হবে। বড় উড়োজাহাজের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত ছোট উড়োজাহাজ থাকায় নতুন গন্তব্যে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্লাইট চালু এবং চাহিদা অনুযায়ী ফ্লাইট বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে।
এয়ারবাসের উড়োজাহাজগুলোর সরবরাহ ২০৩৩ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল পর্যন্ত চলতে পারে। অর্থাৎ আগামী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে বহরে যুক্ত হবে নতুন উড়োজাহাজ। এতে পরিকল্পিতভাবে পুরোনো উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপন এবং নতুন সক্ষমতা যোগ করার সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশের বড় বাজার, বিমানের বড় সুযোগ
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার, পর্যটন ও শিক্ষার জন্য বিদেশগামী যাত্রী—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক আকাশপথে বাংলাদেশের বাজারের সম্ভাবনা বড়। এই বাজারে দেশের নিজস্ব পতাকাবাহী সংস্থার অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগও তাই যথেষ্ট। নতুন উড়োজাহাজ সেই সুযোগ কাজে লাগানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘপাল্লার আধুনিক ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ বিমানের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে যেসব গন্তব্যে কানেক্টিং ফ্লাইটের ওপর নির্ভর করতে হয়, ভবিষ্যতে সেসব রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালুর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে নতুন সক্ষমতার সমন্বয়
বিমানের বহর সম্প্রসারণের সময়েই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালকে ঘিরে বিমানবন্দর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এগোচ্ছে। ফলে নতুন উড়োজাহাজ ও উন্নত বিমানবন্দর অবকাঠামো একসঙ্গে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়লে ফ্লাইট পরিচালনার পরিসরও বাড়বে। নতুন উড়োজাহাজ দিয়ে সেই অতিরিক্ত সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে ঢাকা আরও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাবে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিমানের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো ঢাকাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী কানেক্টিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও এ সম্ভাবনাকে সমর্থন করে।
বহরে বৈচিত্র্য, রুটে নমনীয়তা
বিমানের বহরে এয়ারবাস যুক্ত হওয়ার ফলে বোয়িংয়ের পাশাপাশি আরেকটি নির্মাতার আধুনিক উড়োজাহাজ পরিচালনার অভিজ্ঞতা তৈরি হবে। এতে বহরের বৈচিত্র্য বাড়বে এবং বিভিন্ন রুটের জন্য ভিন্ন ধরনের উড়োজাহাজ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। অবশ্যই এর জন্য পাইলট ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা এবং যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনায় নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রস্তুতি বিমানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাড়াতে পারে। নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ পরিচালনার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ বহর পরিকল্পনায়ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাড়বে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা
আধুনিক উড়োজাহাজের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো জ্বালানি দক্ষতা। নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ দীর্ঘপথে তুলনামূলক দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায়। একই সঙ্গে যাত্রীদের জন্য উন্নত কেবিন, বেশি আরাম এবং দীর্ঘপথের ফ্লাইটে উন্নত ভ্রমণ অভিজ্ঞতা দেওয়ার সুযোগ থাকে।
ফলে নতুন বহর বিমানের পণ্য ও সেবার মান উন্নয়নেরও সুযোগ তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শুধু টিকিটের দাম নয়, উড়োজাহাজের মান, সময়ানুবর্তিতা, কানেক্টিভিটি ও যাত্রীসেবাও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বহর এসব ক্ষেত্রে বিমানের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
সামনে বড় সম্ভাবনার দশক
বিমানের ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী দশকে বাংলাদেশের আকাশপথে একটি বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। পুরোনো উড়োজাহাজের জায়গায় আধুনিক বহর, নতুন আন্তর্জাতিক রুট, বাড়তি আসন সক্ষমতা এবং উন্নত যাত্রীসেবা—সব মিলিয়ে বিমান নতুন পর্যায়ে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বহরের সঙ্গে সমানতালে বাড়াতে হবে রুট পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, বিপণন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার সক্ষমতা। নতুন উড়োজাহাজের প্রতিটি আসনকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোই হবে মূল লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ এবং বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ শুধু বিমানের বহর বড় করার পরিকল্পনা নয়; এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আকাশপথে নিজের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার একটি দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ। পরিকল্পনাটি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হলে আগামী দশকেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য নতুন রুট, নতুন বাজার এবং নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।
কালের আলো/টিইকে/এমকে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:২১ পূর্বাহ্ণ