কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের কাজকে আগের চেয়ে অনেক সহজ ও দ্রুত করে দিয়েছে। লেখা তৈরি, পরিকল্পনা, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা নতুন ধারণা বের করার মতো কাজে কয়েক মুহূর্তেই এআইয়ের সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে সৃজনশীল বিভিন্ন কাজেও দ্রুত বাড়ছে এর ব্যবহার। তবে এআইয়ের এই সুবিধার পাশাপাশি নতুন একটি প্রশ্নও সামনে আসছে—মানুষ যত বেশি এআইয়ের ওপর নির্ভর করবে, তত কি তার চিন্তা ও সৃজনশীলতা একই ধরনের হয়ে উঠবে? সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণার ফলাফল এই আশঙ্কার কিছুটা ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সাইকোলজি টুডে।
এআইয়ে সৃজনশীলতা বাড়লেও কমেছে বৈচিত্র্য
২০২৪ সালে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের আনিল দোশি এবং ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের অলিভার হাউজার ৩০০ জন অংশগ্রহণকারীকে ছোট গল্প লিখতে দেন।
অংশগ্রহণকারীদের একটি দলকে গল্পের ধারণা তৈরিতে এআইয়ের সহায়তা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। অন্য দলকে কোনো এআই সহায়তা দেওয়া হয়নি।
গবেষণায় দেখা যায়, এআইয়ের সহায়তা নেওয়া গল্পগুলোকে তুলনামূলকভাবে বেশি সৃজনশীল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল। বিশেষ করে যাঁরা শুরুতে অপেক্ষাকৃত কম সৃজনশীল ছিলেন, তাঁদের লেখায় উন্নতি বেশি দেখা যায়।
তবে এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে আসে। এআইয়ের সহায়তায় তৈরি গল্পগুলো একে অপরের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি মিল ছিল। অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি লেখার মান বাড়লেও সামগ্রিকভাবে গল্পগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য কিছুটা কমে যায়।
এআই মডেলের উত্তরেও একই প্রবণতা
২০২৬ সালে পিএনএএস নেক্সাস জার্নালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় ২২টি এআই মডেল এবং ১০০ জনের বেশি মানুষের সৃজনশীলতা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এআই মডেলগুলোর দেওয়া উত্তর মানুষের উত্তরের তুলনায় অনেক বেশি একই ধরনের ছিল। অর্থাৎ একই ধরনের সৃজনশীল প্রশ্নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন এআই মডেলের উত্তরগুলোতে মানুষের উত্তরের তুলনায় বেশি মিল দেখা যায়। এর সম্ভাব্য একটি কারণ হিসেবে মনোবিজ্ঞানের ‘অ্যাঙ্করিং’ বা প্রাথমিক ধারণার প্রভাবের কথা বলা হচ্ছে।
প্রথম পাওয়া ধারণাই হয়ে উঠতে পারে ‘অ্যাঙ্কর’
মনোবিজ্ঞানী আমোস টভারস্কি ও ড্যানিয়েল কাহনেম্যান ১৯৭৪ সালের গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মানুষ শুরুতে পাওয়া কোনো সংখ্যা, তথ্য বা ধারণার দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। এই প্রাথমিক তথ্য পরবর্তী চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। কোনো বিষয়ে মানুষ নিজে চিন্তা করার আগেই যদি এআইয়ের কাছ থেকে একটি উত্তর পেয়ে যায়, তাহলে সেটিই তার চিন্তার প্রথম ভিত্তি বা ‘অ্যাঙ্কর’ হয়ে উঠতে পারে। একই ধরনের প্রশ্নে লাখো মানুষ যদি এআইয়ের কাছ থেকে কাছাকাছি ধরনের উত্তর পান, তাহলে তাঁদের পরবর্তী চিন্তা ও ধারণার মধ্যেও কিছুটা মিল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তাহলে কি এআই সৃজনশীলতা নষ্ট করে দেবে?
গবেষণাগুলোর ফলাফল এমনটা বলছে না যে এআই ব্যবহার করলেই মানুষের সৃজনশীলতা হারিয়ে যাবে। বরং বিষয়টি নির্ভর করতে পারে এআইকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে আসা একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো—কোনো কাজ শুরু করার আগে নিজের চিন্তা তৈরি করা। ধারণাগুলো অসম্পূর্ণ বা অপরিণত হলেও প্রথমে নিজের মতো করে লিখে নেওয়া যেতে পারে। এরপর এআইকে সেই ধারণা পরিশীলিত, বিস্তৃত বা সংগঠিত করার কাজে ব্যবহার করা হলে ব্যক্তিগত চিন্তার স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। অর্থাৎ এআইকে নিজের হয়ে চিন্তা করার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে নিজের চিন্তার সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করাই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ভিন্নভাবে ভাবার গুরুত্ব বাড়ছে
সবাই যখন একই ধরনের এআই টুল ব্যবহার করছে এবং কাছাকাছি ধরনের উত্তর পাচ্ছে, তখন প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে চিন্তা করার গুরুত্ব আরও বেড়ে যেতে পারে। একই সমস্যার জন্য এআই যে সমাধান দিচ্ছে, সেটিই চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার পরিবর্তে নিজের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি দিয়ে তা যাচাই করা প্রয়োজন। কখনো কখনো প্রচলিত বা নিরাপদ ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু চেষ্টা করাই একজন মানুষের কাজকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলতে পারে।
মানুষের অভিজ্ঞতার জায়গা এখনো আলাদা
মানুষের সৃজনশীলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আবেগ, হাস্যরস ও সহমর্মিতা। এসব বিষয় এআইয়ের সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রেও গবেষণা হয়েছে। ২০২৫ সালে নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার জার্নালে প্রকাশিত একাধিক গবেষণায় দেখা যায়, একই ধরনের সহানুভূতিশীল বার্তা মানুষ ও এআই—দুই পক্ষের নামে উপস্থাপন করা হলে অংশগ্রহণকারীরা মানবসৃষ্ট বার্তাকে তুলনামূলকভাবে বেশি সহানুভূতিশীল ও সহায়ক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মানবিক সংযোগ এখনো সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
এআইয়ের সঙ্গে মানুষের ভবিষ্যৎ সৃজনশীলতা
এআই নিঃসন্দেহে মানুষের কাজকে দ্রুত ও সহজ করে তুলছে। তবে একই সঙ্গে এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা চিন্তার বৈচিত্র্য কমিয়ে দিতে পারে কি না—এ প্রশ্নটি ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এআইকে ব্যবহার করার সময় নিজের চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও কৌতূহলকে সামনে রাখা জরুরি। প্রথমে নিজে ভাবা, নিজের ধারণা তৈরি করা এবং পরে এআইয়ের সাহায্যে সেটিকে আরও উন্নত করা হলে প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সৃজনশীলতাও ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এআই হয়তো কাজের গতি বাড়াবে, কিন্তু কোনো ধারণাকে সত্যিকার অর্থে আলাদা করে তুলতে মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল চিন্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে থাকতে পারে।
কালের আলো/এসএ

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:৩৩ অপরাহ্ণ