শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীর পাড়ে কাশফুলের দোলা। এরই মধ্যে শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে গাইবান্ধার গ্রাম-গঞ্জে। জেলার সাত উপজেলায় এবার ৬২৯টি মন্দির ও মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। মহালয়ার পর থেকেই মণ্ডপগুলো ঘিরে শুরু হয়েছে মেলার প্রস্তুতি। আর এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ তৈরি করতে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন বাদিয়াখালী ইউনিয়নের পালপাড়া ও শহরের কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পীরা।
পালপাড়ায় ঢুকতেই পাওয়া যায় কাঁচা মাটির সোঁদা গন্ধ। উঠোনজুড়ে সারি সারি হাতি, ঘোড়া, ময়ূর, পাখি ও পুতুল রোদে শুকানো হচ্ছে। কারিগরদের নিপুণ হাতে রূপহীন মাটির পিণ্ড ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে রঙিন খেলনায়।
উৎসবের কয়েক মাস আগে থেকেই নদী ও বিলের তলদেশ থেকে সংগ্রহ করা হয় বিশেষ এঁটেল মাটি। শুকিয়ে গুঁড়ো করে পানিতে ভিজিয়ে রাখার পর পা দিয়ে ছেনে নরম ও মসৃণ করা হয়। এরপর ছাঁচে ফেলে তৈরি করা হয় নানা ধরনের পণ্য। রোদে শুকানোর পর ইট ও তুষ দিয়ে তৈরি ভাটায় উচ্চ তাপে পোড়ানো হয় সেগুলো।
সবশেষে শুরু হয় রং করার কাজ। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ ও সাদা রঙের তুলির আঁচড়ে মাটির তৈরি খেলনায় প্রাণ সঞ্চার করেন কারিগর ও তাঁদের পরিবারের নারীরা।
এবার গাইবান্ধার মৃৎশিল্পীরা প্রায় ৫০ ধরনের পণ্য তৈরি করছেন। এর মধ্যে রয়েছে মাটির ব্যাংক, হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, হাতি, ঘোড়া, পাখি, ময়ূর, বাঘ এবং বিভিন্ন ফলের প্রতিকৃতি।
বাদিয়াখালী পালপাড়ার কারিগর যোগেন পাল প্রায় ৪০ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তার পূর্বপুরুষরা শত বছর ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত। ছোটবেলা থেকেই বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছেন তিনি। এখন স্ত্রী সবিতা পালকে সঙ্গে নিয়ে দিনরাত পণ্য পোড়ানো ও রং করার কাজে ব্যস্ত।
সবিতা পাল বলেন, উৎসবের সময় কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। মণ্ডপসংলগ্ন মেলায় পসরা সাজাতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পণ্য তৈরি করতে হয়। ফলে পূজার আগে দম ফেলারও সময় থাকে না।
পূজার মৌসুমটি এসব প্রান্তিক শিল্পীর কাছে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। উৎসবের আগেই বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতা ও পাইকাররা পালপাড়ায় এসে পণ্যের বায়না দেন। একসঙ্গে বড় পরিমাণ পণ্য বিক্রি হওয়ায় এ সময় কিছুটা এককালীন আয় হয়। তবে অনেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে নিজেরাই মেলায় অস্থায়ী দোকান দিয়ে পণ্য বিক্রি করেন।
যোগেন পাল জানান, খুচরা বিক্রি করেও প্রতি পিস খেলনায় গড়ে প্রায় দুই টাকা লাভ থাকে। বছরের অন্য সময়ে তারা দইয়ের সরা, পাতিল, ফুলের টবসহ বিভিন্ন মাটির পণ্য তৈরি করে সংসার চালান। দুর্গাপূজা ও কালীপূজার মৌসুমে বাড়তি যে আয় হয়, তা দিয়ে বছরের পরবর্তী কয়েক মাসের খরচ মেটাতে হয়।
তবে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন নানা সংকটে। বাজারে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের সস্তা ও টেকসই খেলনার দাপটে মাটির খেলনার চাহিদা কমেছে। শিশুদের মধ্যেও প্লাস্টিকের খেলনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। এর সঙ্গে মাটি, তুষ, কাঠ ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী বাড়েনি পণ্যের দাম।
ন্যায্য পারিশ্রমিক না পাওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের পালপাড়াতেও দেখা গেছে একই চিত্র। পুরুষরা পর্যাপ্ত মুনাফা না পেয়ে অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় নারীরাই কোনোভাবে এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
গাইবান্ধা জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুজন প্রসাদ বলেন, মৃৎশিল্প গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৈশাখী মেলা, দুর্গোৎসবসহ বিভিন্ন পার্বণে মাটির তৈরি পণ্যের আবেদন এখনো রয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষক তপন রায় বলেন, মেলায় আধুনিক পণ্য ও প্লাস্টিকের খেলনার পাশাপাশি মাটির খেলনার স্টলও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। এসব খেলনার মাধ্যমে শিশুরা দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়। একই সঙ্গে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে মাটির পণ্য পরিবেশবান্ধব।
শত বছরের পুরোনো এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সহজ শর্তে স্বল্প সুদের ঋণ, আধুনিক নকশা তৈরির প্রশিক্ষণ, উন্নত বিপণনব্যবস্থা এবং জাতীয় পর্যায়ের মেলা ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সরাসরি বিক্রির সুযোগ তৈরি করা গেলে কারিগররা লাভবান হতে পারেন।
বিসিক গাইবান্ধার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রান্তিক মৃৎশিল্পীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আবেদন করলে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের আওতায় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী খেলনার সঙ্গে টেরাকোটা, পোড়ামাটির গয়না ও গৃহসজ্জার সামগ্রী তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে নতুন বাজার তৈরি হতে পারে।
মণ্ডপে দেবীর প্রতিমা আর মেলার মাঠে রঙিন খেলনার সারিতে মিশে আছে গাইবান্ধার পালপাড়ার মানুষের শ্রম ও স্বপ্ন। যোগেন, সবিতা ও তাঁদের মতো কারিগরদের হাত ধরে টিকে থাকা এই লোকঐতিহ্য সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ফিরে পেতে পারে হারানো গৌরব। মাটির এই শিল্প বাঁচানো মানে শুধু কিছু কারিগরের জীবিকা রক্ষা নয়, বাংলার শত বছরের সংস্কৃতিকেও বাঁচিয়ে রাখা।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

গাইবান্ধা সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:৩৯ অপরাহ্ণ