রাজধানী থেকে জেলা শহর—অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের দাপটে বাড়ছে প্রকাশ্য গুলি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী হামলা ও হত্যাকাণ্ড। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ ২১ জেলায় ১৩৮টি গুলির ঘটনায় প্রাণ গেছে ৬৭ জনের, আহত হয়েছেন অন্তত ১৪৫ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ১৩ শতাধিক এখনো উদ্ধার হয়নি। এর সঙ্গে সীমান্তের চোরাই পথেও দেশে ঢুকছে নতুন অস্ত্র। ফলে অপরাধীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা এখন জননিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
- ৯ মাসে ২১ জেলায় ১৩৮ গুলির ঘটনা
- প্রাণ গেছে ৬৭ জনের
- লুট হওয়া ১৩ শতাধিক অস্ত্র এখনো অধরা
রাজধানীতে প্রকাশ্যেই অস্ত্রের ব্যবহার
রাজধানীর বাংলামোটরে গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ওষুধ ব্যবসায়ী সোহানের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে তাঁকে মারধর এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ফাঁকা গুলি ছোড়ার ঘটনা সেই উদ্বেগেরই উদাহরণ। এ সময় তাঁর মাথায় অস্ত্রের বাঁট দিয়েও আঘাত করা হয়। পরে অস্ত্রসহ বহিষ্কৃত যুবদল নেতা সাইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ডিএমপি সূত্র জানায়, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে রাজধানীতে ১৭টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে ছয়জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে খুলনায় ঘটেছে সর্বোচ্চ ৩৯টি ঘটনা। চট্টগ্রামেও ঘটেছে ৩১টি।
লুটের অস্ত্রই এখন বড় উদ্বেগ
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে লুট হওয়া অস্ত্রের বড় অংশ অপরাধীদের হাতে চলে যায়। থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ১৩ শতাধিক এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। শুধু লুট হওয়া অস্ত্রই নয়, সীমান্তের চোরাই পথেও দেশে ঢুকছে আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় অপরাধীদের সক্ষমতাও বাড়ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া অস্ত্র দিয়েই পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটেছে।
কিশোর-তরুণরাই ভাড়াটে শ্যুটার
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহর থেকে গ্রাম—বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠছে অস্ত্রধারী ছোট ছোট চক্র। এসব চক্রে কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার করা হচ্ছে ভাড়াটে শ্যুটার হিসেবে। অর্থের বিনিময়ে তারা চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই ও আধিপত্য বিস্তারে অস্ত্র ব্যবহার করছে। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার ঘটনাও বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা প্রতিশোধের আশঙ্কায় থানায় অভিযোগ করতেও সাহস পাচ্ছেন না।
অভিযানে উদ্ধার হচ্ছে অস্ত্র, কমছে না ব্যবহার
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, শুক্রবার (১ মে) থেকে বুধবার (২৬ আগস্ট) পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪ হাজার ৭২২ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ১৬৫টি ম্যাগাজিনসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে তথ্যদাতাদের জন্য বড় অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা এবং লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ ইউনিট গঠনের কথাও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৫ সালেও দেশে ২৫০ জনের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হন; মারা যান অন্তত ৮০ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের পরিসংখ্যান কোনো বিচ্ছিন্ন প্রবণতা নয়। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। অপরাধীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করে একের পর এক ঘটনা ঘটাচ্ছে। ফলে শুধু অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের মধ্যে সমাধান সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, সীমান্তপথে অস্ত্র প্রবেশ বন্ধ, অস্ত্রধারী চক্র ভেঙে দেওয়া এবং অস্ত্রের উৎস শনাক্ত—এই চার ক্ষেত্রে একযোগে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের দাপট থামানো কঠিন হবে।
কালের আলো/এমএসআইপি/এমকে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:০১ অপরাহ্ণ