মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে দেশের ৭ লাখের বেশি শিক্ষককে একটি করে আধুনিক ট্যাবলেট-কম্পিউটার দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকরা এ সুবিধার আওতায় আসবেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
১৭ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প
মাউশির পরিকল্পনা শাখা জানিয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ গড়ে তুলতে ১৭ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ৭ লাখের বেশি শিক্ষককে একটি করে আধুনিক ট্যাবলেট-কম্পিউটার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর আওতায় আনারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ১০টি করে স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন, শ্রেণিকক্ষগুলোতে ইন্টারঅ্যাক্টিভ এডুকেশন প্যানেল বসানো এবং ১০০ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য একক ‘এডু আইডি’ চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
কারা পাবেন ট্যাবলেট?
মাউশির আওতাধীন সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানকারী শিক্ষকদের এ সুবিধার আওতায় রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে ডিভাইস বিতরণের ক্ষেত্রে শিক্ষকসংখ্যা, প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক তথ্য বিবেচনা করা হতে পারে। চূড়ান্ত তালিকা ও বিতরণসংক্রান্ত নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে ট্যাবলেট-কম্পিউটার দেওয়া হলে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনা আরও সহজ হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর শেখার সুযোগও বাড়বে।
৩২ জেলায় হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট
শুধু প্রযুক্তি সরবরাহ নয়, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অবকাঠামো শক্তিশালী করতেও বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ৩২টি বৃহৎ জেলায় ‘হায়ার সেকেন্ডারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’ বা এইচএসটিটিআই স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রস্তাবিত উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষকদের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আরও ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ লাখ শিক্ষককে ৩৫ দিনব্যাপী মিশ্র পদ্ধতির বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি ১০ হাজার অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষকে ২৩ দিনব্যাপী নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ এবং ৪ হাজার গভর্নিং বডি সদস্যকে সমন্বিত ওরিয়েন্টেশন দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রশিক্ষণ পাবেন সাড়ে ৩ লাখের বেশি শিক্ষক
শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ বা লেইস প্রকল্পের আওতায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ৫৬৬ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২৬ হাজার ৮৮০ জন নতুন শিক্ষকের জন্য ৫৬ দিনব্যাপী আবাসিক বেসিক ট্রেনিং এবং ৫৩ হাজার ৭৬০ জন শিক্ষকের জন্য ৪২ দিনব্যাপী আবাসিক প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ ছাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ২৪ হাজার ৪০০ জন প্রধান শিক্ষককে ২১ দিনব্যাপী লিডারশিপ ট্রেনিং দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ১১ হাজার শিক্ষককে জলবায়ু ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও আইসিটিতেও গুরুত্ব
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন, কাউন্সেলিং এবং বুলিং প্রতিরোধেও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৪০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে ২৯ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষককে।
শিক্ষকদের ‘স্মার্ট দক্ষতায়’ রূপান্তরের লক্ষ্য
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল গণমাধ্যমে বলেন, প্রকৃত মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের স্মার্ট দক্ষতায় রূপান্তরের বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন শিক্ষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষেও বাড়বে ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবহার। স্মার্ট ক্লাসরুম, আধুনিক ডিভাইস ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক—এই তিনের সমন্বয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কালের আলো/জেএন

শিক্ষা ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:০৬ অপরাহ্ণ