নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সড়কবাতিরও দেখা মেলে না। বর্জ্য অপসারণ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা অপ্রতুল। নালা ব্যবস্থাপনার বেহাল দশার পাশাপাশি কাঁচা-পাকা সড়কের অবস্থাও নাজুক। অল্প বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। অথচ বছর ঘুরলেই পৌরবাসীর ওপর চাপছে কয়েক গুণ বেশি কর। এমন চিত্র ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু পৌরসভার।
২০০২ সালের ২৫ অক্টোবর ‘গ’ শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে হরিণাকুণ্ডু প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এটি ‘খ’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। ১২ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ পৌরসভায় রয়েছে ৯টি ওয়ার্ড। জনসংখ্যা ৩০ হাজার ৩৭৬। বর্তমানে ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে পৌরসভাটি।
পৌর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পৌর এলাকায় মোট ৭০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ কিলোমিটার পাকা এবং ৪০ কিলোমিটার কাঁচা। ড্রেনেজ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে মাত্র ৩ কিলোমিটার পাকা ও ১০ কিলোমিটার কাঁচা নালা।
জলাবদ্ধতা ও দুর্ভোগ নিত্যসঙ্গী
৬ নম্বর ওয়ার্ডের কারিগরপাড়ার বাসিন্দা জামিরুল ইসলাম বলেন, নামেই এটি পৌরসভা। রাস্তাঘাটের তেমন উন্নয়ন হয়নি। খাওয়ার পানির ব্যবস্থাও করা হয়নি। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষায় বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। পৌরসভার নিষ্ক্রিয়তার কারণে বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই সড়ক কেটে পাইপ বসিয়ে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনের চিন্তা করছেন।
ইজিবাইক চালক জমির উদ্দিন বলেন, শহরতলির অধিকাংশ সড়ক বেহাল। চলাচলে দুর্ভোগের শেষ নেই। সন্ধ্যার পর সড়কবাতি না থাকায় অনেক এলাকায় অন্ধকার নেমে আসে। এতে চুরির ঘটনাও বাড়ছে।
কর নিয়ে ক্ষোভ
পৌরসভার কর বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ৫ হাজার ৪৮৫টি বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হোল্ডিং করের আওতায় রয়েছে। চলতি বছর কর পুনর্নির্ধারণের পর অন্তত ২ হাজার নাগরিক অতিরিক্ত করের প্রতিবাদ জানিয়ে পুনর্নির্ধারণের আবেদন করেন। পরে শুনানির মাধ্যমে অনেকের কর কিছুটা কমানো হয়।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের টাওয়ারপাড়ার বাসিন্দা আশিকুর রহমান বলেন, গত বছর তাঁর হোল্ডিং ট্যাক্স ছিল ২৫০ টাকা। এ বছর তা বাড়িয়ে ৯০০ টাকা করা হয়েছে।
৪ নম্বর ওয়ার্ডের চিথলিয়াপাড়ার বাসিন্দা বেলিনা খাতুন জানান, তাঁর বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স ৩৬০ টাকা থেকে একবারে ৩ হাজার ৮৫০ টাকা করা হয়েছিল। আবেদনের পর শুনানির মাধ্যমে তা কমিয়ে ৭৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
হরিণাকুণ্ডু পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত সচিব আক্তারুজ্জামান বলেন, প্রতিবছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে চার কিস্তিতে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ আসে। এ অর্থ দিয়ে কিছু রাস্তাঘাট সংস্কার করা হয়। পাশাপাশি আরও দুটি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন সড়কসহ বিভিন্ন কাজ চলছে। তাঁর দাবি, পৌরবাসী মোটামুটি সেবা পাচ্ছেন।
তিনি জানান, চলতি বছর ২৬ লাখ টাকা বেসরকারি কর এবং ৩৬ লাখ টাকা সরকারি কর ধার্য করা হয়েছিল। সরকারি কর পুরোপুরি আদায় হলেও বেসরকারি কর আদায়ে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। সংগৃহীত কর ও হাটবাজার ইজারা থেকে পাওয়া অর্থ পৌরসভার নিজস্ব তহবিলে জমা হয়। সেখান থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়।
পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ্ত রায় দীপন বলেন, পৌরসভার টেকসই উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সভায় ইতোমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে।
জেলা সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আনোয়ারুজ্জামান আজাদ বলেন, উন্নয়নের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মানুষ বছরের পর বছর কর দেবে, অথচ সেবা পাবে না—এটি হতে পারে না। নাগরিকদের সেবা পাওয়া তাদের অধিকার।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

ঝিনাইদহ সংবাদদাতা
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ