ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযান নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর মধ্যেই সক্রিয় হয়েছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’। জোটের প্রথম জরুরি বৈঠকে সৌদি আরবে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠেছে পাকিস্তানকে ঘিরে—ইসলামাবাদ কি শুধু সৌদি আরবের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে?
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ অবশ্য দাবি করেছেন, পাকিস্তানি বাহিনী আপাতত সহায়ক ও প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকায় রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান ও তুরস্কের বাহিনী রিকনেসান্সসহ বিভিন্ন সহায়ক কাজে যুক্ত থাকলেও ইয়েমেনে মূল লড়াই করছে সৌদি বাহিনী।
প্রথমবার কার্যকর হলো ‘মক্কা চুক্তি’
গত আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৫ অক্টোবর রিয়াদে জরুরি বৈঠকের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো চুক্তিটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জোটের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনুমোদিত ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন মেনে সৌদি আরবে প্রয়োজনীয় সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতা দ্রুত মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাহিনীর আকার কিংবা তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান জানিয়েছেন, হুতিদের হামলা এবং এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে জোটের কাঠামোর মধ্যে থেকে সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কমিটি একমত হয়েছে।
পাকিস্তানের ভূমিকা কতটা?
জরুরি বৈঠকের পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, পাকিস্তানি বাহিনী ইতোমধ্যে সৌদিতে তাদের ভূমিকা পালন শুরু করেছে।
তিনি বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্কের বাহিনী সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এবং রিকনেসান্সসহ বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছে। তবে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই মূলত সৌদি বাহিনীই পরিচালনা করছে।
এ বক্তব্য থেকেই আপাতত পাকিস্তানের অবস্থান অনেকটা স্পষ্ট—ইসলামাবাদ সৌদি আরবকে রক্ষায় পাশে থাকতে চায়, কিন্তু ইয়েমেনের মাটিতে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইছে।
তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, সৌদি আরবের অভিযান যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় কিংবা ইয়েমেনে স্থলভাগে বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়, তখন পাকিস্তানের পক্ষে এই সীমারেখা কতটা বজায় রাখা সম্ভব হবে?
সৌদিতে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি নতুন নয়
সৌদি আরবে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি বহু পুরোনো। ১৯৬৭ সাল থেকেই পাকিস্তান সৌদি সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। ১৯৮২ সালের একটি চুক্তির মাধ্যমে সৌদিতে পাকিস্তানি সেনা প্রেষণের বিষয়টি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পাকিস্তান বড় ধরনের সামরিক দল পাঠিয়েছিল।
এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুই দেশ একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির মূল নীতির মধ্যে রয়েছে—এক দেশের ওপর হামলাকে দুই দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা।
এ বছর এপ্রিলেও সৌদি আরব নিশ্চিত করে যে পাকিস্তানের একটি সামরিক বহর, যার মধ্যে যুদ্ধবিমান ও সহায়ক বিমান রয়েছে, দেশটির কিং আবদুল আজিজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে। বর্তমানে সৌদিতে ঠিক কত পাকিস্তানি সেনা রয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
পাকিস্তান কি ইয়েমেনে হামলায় অংশ নেবে?
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। সৌদি আরব ইতোমধ্যে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পাল্টা অভিযানে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০০টি যুদ্ধবিমান এই অভিযানে বিমান সহায়তা দিচ্ছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর লক্ষ্যও এখন শুধু সাম্প্রতিক সময়ে হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারে সীমাবদ্ধ নেই। তারা রাজধানী সানা পুনর্দখলের কথাও বলছে। ২০১৪ সাল থেকে সানা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যেতে পারে। কারণ সৌদি ভূখণ্ড রক্ষা করা আর ইয়েমেনের ভেতরে ঢুকে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা—দুটি একেবারেই ভিন্ন সামরিক অবস্থান।
পাকিস্তানের সামনে ইরানের সতর্কবার্তা
পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইরান। তেহরান ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, ইয়েমেনে নতুন করে কোনো বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ইরানের বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানি সেনারা যদি সৌদি ভূখণ্ড, সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি এক বিষয়। কিন্তু হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নিলে সেটিকে তেহরান ভিন্নভাবে দেখতে পারে।
অর্থাৎ পাকিস্তানের জন্য সীমারেখাটি খুব স্পষ্ট—সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা নাকি ইয়েমেনে আক্রমণ।
কী ধরনের সহায়তা দিতে পারে পাকিস্তান?
বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তান সম্ভবত বিশাল স্থলবাহিনী পাঠানোর পরিবর্তে বিশেষায়িত সামরিক সক্ষমতা দিয়ে সৌদিকে সহায়তা করতে পারে।
এর মধ্যে থাকতে পারে—আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট, ড্রোন ও নজরদারি ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগব্যবস্থা, সাইবার সক্ষমতা, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট, বিশেষায়িত সামরিক দল।
এ ধরনের সহায়তা পাকিস্তানকে সৌদি প্রতিরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ দেবে, একই সঙ্গে ইয়েমেনের সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম রাখবে।
তুরস্কের ভূমিকাও এখনও সীমিত
মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তানের পাশাপাশি তুরস্কও রয়েছে। তবে আঙ্কারার সামরিক ভূমিকা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তুরস্কের পক্ষ থেকে সৌদিকে প্রযুক্তিগত ও প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন, গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। তবে চুক্তিটি তুর্কি পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের বিষয়টি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে তুরস্কের অংশগ্রহণও আপাতত সরাসরি স্থলযুদ্ধের বদলে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে।
সৌদি আরব আসলে কী চায়?
বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ আপাতত এমন একটি অভিযান চায়, যার মাধ্যমে হুতিদের হামলা ঠেকিয়ে সৌদি ভূখণ্ডে আবারও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করা যায়।
কিন্তু পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে যদি সৌদি নেতৃত্ব হুতিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে দিতে কিংবা সানা পুনর্দখলের মতো বড় লক্ষ্য নেয়।
কারণ সে ক্ষেত্রে অভিযান স্বল্পমেয়াদি না হয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। আর তখন পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো মিত্রদের ওপর সামরিক ও রাজনৈতিক চাপও বাড়বে।
তাহলে কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জড়াবে পাকিস্তান?
এই মুহূর্তে পাকিস্তান সরাসরি ইয়েমেনের যুদ্ধে প্রবেশের ঘোষণা দেয়নি। বরং ইসলামাবাদ বারবার তাদের ভূমিকা ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বলে তুলে ধরছে।
তবে সৌদি আরবের ওপর হামলা বাড়লে, ইয়েমেনে অভিযান দীর্ঘ হলে কিংবা সৌদি ভূখণ্ড রক্ষার সংজ্ঞা যদি আরও বিস্তৃত হয়—তাহলে পাকিস্তানের জন্য সরাসরি সম্পৃক্ততা এড়িয়ে চলা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও সামরিক পরীক্ষা ইসলামাবাদের।
একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে ইয়েমেন সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়লে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, প্রশ্নটা এখন শুধু পাকিস্তান যুদ্ধে জড়াবে কি না—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সৌদি আরবকে রক্ষা করতে গিয়ে পাকিস্তান ঠিক কোথায় নিজের সামরিক সীমারেখা টানবে।
কালের আলো/জেএন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ