একদিকে রুপালি পর্দায় দাপুটে উপস্থিতি, তীক্ষ্ণ সংলাপ আর চোখের এক চাহনিতেই চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা। অন্যদিকে ক্যামেরার আড়ালে নিঃশব্দে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক সংবেদনশীল মানুষ। ভারতীয় চলচ্চিত্রে নানা পাটেকার ছিলেন ঠিক এমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব—যাকে শুধু ‘অভিনেতা’ শব্দে আটকে রাখা যায় না। ৭৫ বছর বয়সে সেই বহুমাত্রিক মানুষটির জীবন থেমে গেল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোয়ায় নিজের বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর নানা পাটেকারকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা দীর্ঘ সময় সিপিআর দিয়ে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোক নেমে আসে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্র অঙ্গনে। তবে নানা পাটেকারের বিদায় যেন শুধু একজন তারকার বিদায় নয়; এটি এমন এক শিল্পীর অধ্যায়ের সমাপ্তি, যিনি পর্দায় যেমন শক্তিমান ছিলেন, বাস্তব জীবনেও তেমনি মানুষের কষ্টে নরম হয়ে উঠতেন।
যে মানুষটি গাড়ি কেনার স্বপ্ন বদলে দিয়েছিলেন
তার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত মানবিক গল্পগুলোর একটি হয়তো কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। দেড় কোটি রুপির একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার সুযোগ ছিল। ইচ্ছা করলে সেই গাড়ি তার গ্যারেজে জায়গা করে নিতে পারত। কিন্তু টেলিভিশনের পর্দায় যখন খরা, ঋণের বোঝা আর আত্মহত্যায় বিপর্যস্ত কৃষক পরিবারের খবর দেখলেন, তখন বদলে গেল সিদ্ধান্ত। গাড়ির বদলে তিনি বেছে নিলেন মানুষকে।
চিত্রনাট্যকার রণবীর পুষ্পের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে নানা পাটেকার কৃষক পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন। অসহায় পরিবারগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য ১৫ হাজার রুপি করে চেক প্রস্তুত করা হয়েছিল। এখানেই শেষ নয়। কৃষকদের জন্য তার সেই উদ্যোগ পরে আরও বড় সামাজিক কর্মকাণ্ডে রূপ নেয়। গড়ে ওঠে ‘নাম ফাউন্ডেশন’, যার মাধ্যমে কৃষক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজ চালিয়ে যান তিনি। অর্থাৎ, যে মানুষটি পর্দায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন, বাস্তব জীবনেও নিজের সামর্থ্যকে মানুষের কাজে লাগানোর পথ বেছে নিয়েছিলেন।
‘নানা’ নামটির আড়ালে ছিল অন্য এক বিশ্বনাথ
নানা পাটেকারের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকার। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ দিয়ে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু। এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা। ‘পরিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘ওয়াজুদ’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘অপহরণ’—প্রতিটি সিনেমায় যেন নিজের অভিনয়ের আরেকটি দরজা খুলেছেন তিনি। কখনো পুলিশ, কখনো রাজনীতির অন্ধকার চরিত্র, কখনো অপরাধী—চরিত্র বদলেছে, কিন্তু অভিনয়ের তীব্রতা বদলায়নি। তার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সংলাপের বাইরেও কথা বলতে পারা। চোখের দৃষ্টি, শরীরী ভাষা কিংবা কয়েক সেকেন্ডের নীরবতাও তার অভিনয়ে হয়ে উঠত পূর্ণাঙ্গ সংলাপ।
‘উদয় শেট্টি’ হয়ে দর্শকের ঘরে ঘরে
যে অভিনেতাকে এতদিন দর্শক দেখেছেন গম্ভীর ও তীব্র চরিত্রে, সেই মানুষটিই ‘ওয়েলকাম’-এ এসে হাজির হলেন সম্পূর্ণ অন্য রূপে। গ্যাংস্টার উদয় শেট্টির চরিত্রে নানা পাটেকারের অভিনয় সিনেমাটিকে যেমন জনপ্রিয় করেছিল, তেমনি তার ক্যারিয়ারেও যোগ করেছিল এক ভিন্ন মাত্রা। রাগী মুখ, ভয়ংকর ব্যক্তিত্ব আর হাস্যরসের অদ্ভুত মিশ্রণে উদয় শেট্টি হয়ে ওঠে দর্শকের অন্যতম প্রিয় চরিত্র। ‘ওয়েলকাম ব্যাক’-এও সেই চরিত্রে ফিরে এসে প্রমাণ করেন—গভীর অভিনয়ের পাশাপাশি কমেডির সময়জ্ঞানেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ।
‘নটসম্রাট’-এ যেন নিজের জীবনকেই অভিনয় করলেন
নানা পাটেকারের অভিনয়জীবনের অন্যতম মাইলফলক মারাঠি সিনেমা ‘নটসম্রাট’। একজন কিংবদন্তি মঞ্চ অভিনেতার জীবনের উত্থান-পতন, অহংকার, একাকীত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন—সবকিছুকে এমন তীব্রতায় পর্দায় তুলে ধরেছিলেন তিনি যে চরিত্র আর অভিনেতার সীমারেখা যেন অনেক সময় মিলেমিশে গিয়েছিল। এই অভিনয়ের জন্যও তিনি ব্যাপক প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করেন। তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও পদ্মশ্রীসহ নানা সম্মান তার ঝুলিতে থাকলেও তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল দর্শকের স্বীকৃতি।
খ্যাতির চেয়ে মানুষের কষ্ট বড় ছিল
তারকা হওয়ার পরও নানা পাটেকারের জীবনযাপন নিয়ে ছিল এক ধরনের সরলতা। আর মানুষের কষ্টের বিষয়টি তাকে সহজেই নাড়া দিত। ঘনিষ্ঠজনদের বর্ণনায়, অন্যায় দেখলে তিনি চুপ করে থাকতেন না। রাস্তায় কেউ ময়লা ফেললেও প্রতিবাদ করতেন, নাগরিক দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিতেন। এই স্পষ্টবাদিতাই কখনো তাকে রাগী বা কঠোর হিসেবে পরিচিত করেছে। কিন্তু সেই কঠোরতার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক ধরনের গভীর দায়বদ্ধতা।
ক্যামেরার সামনে শেষ নয়, ক্যামেরার বাইরেও রয়ে গেলেন
নানা পাটেকারের মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র হারাল এক শক্তিমান অভিনেতাকে। কিন্তু তার গল্প শুধু সিনেমার নয়। তিনি দেখিয়ে গেছেন, তারকা হওয়া আর মানুষ হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। কোটি মানুষের পরিচিত মুখ হয়েও একজন মানুষ চাইলে নিজের আলো অন্যের জীবনে পৌঁছে দিতে পারেন। দেড় কোটি রুপির গাড়ি না কিনে কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর সেই সিদ্ধান্ত তাই হয়তো তার অভিনীত শত শত চরিত্রের চেয়েও বেশি সময় মনে থাকবে। কারণ সিনেমার পর্দা একদিন নামতে হয়। আলো নিভে যায়। চরিত্র শেষ হয়। কিন্তু একজন মানুষ মানুষের জন্য কী রেখে গেলেন—সেটিই শেষ পর্যন্ত তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। নানা পাটেকার চলে গেলেন। পর্দার ‘নানা’ আর ফিরবেন না। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানো সেই মানুষটির গল্প—সম্ভবত আরও অনেকদিন বেঁচে থাকবে।
কালের আলো/জেএন

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ