জনআস্থা পুনর্গঠন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব এবং মানবাধিকারের প্রতি সংবেদনশীলতা—পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশ পুলিশের সামনে এখন এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মের পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) বাংলাদেশ মো. আলী হোসেন ফকির বিপিএম। তাঁর মতে, সততা, আন্তরিকতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই আগামী দিনের টেকসই ও নিরাপদ বাংলাদেশ নির্মাণে পুলিশ অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) সকালে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের হল অব ইন্টেগ্রিটিতে ৪৩তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের বিভিন্ন ইউনিটে পদায়িত সহকারী পুলিশ সুপারদের (এএসপি) যোগদানপূর্ব দিকনির্দেশনামূলক ব্রিফিংয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি এসব কথা বলেন।
- রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ
- আইন ও বিধি-বিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ
- মানবাধিকার, নারী, শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বাড়াতে হবে সংবেদনশীলতা
আইজিপি বলেন, দীর্ঘ সতেরো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর নির্বাচিত বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বিপুল জনাকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে দায়িত্ব পালন করছে। পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ পুলিশকেও নতুন পথরেখা নির্মাণ করতে হয়েছে। সেই নতুন পুলিশিংয়ে জনপ্রত্যাশা, মানবাধিকার এবং নারী, শিশু ও বয়স্ক নাগরিকদের প্রতি সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নব উদ্যম ও অঙ্গীকার নিয়ে জনপ্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে।’ প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তাকে বাহিনীর একজন অ্যাম্বাসেডর হিসেবে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
পুলিশিং শুধু আইন প্রয়োগ নয়, আস্থার সম্পর্কও
আইজিপির বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পুলিশ-জনগণের সম্পর্ক। তিনি বলেন, পুলিশিং একটি সেবা ও চ্যালেঞ্জ। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সমাজ ও রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

নবীন কর্মকর্তাদের ‘ভবিষ্যৎ পুলিশ লিডার’ আখ্যা দিয়ে আইজিপি বলেন, নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেদের তৈরি করতে হবে। নিত্যনতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হতে হবে। দায়িত্ব পালনের সময় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আইন ও বিধি-বিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং পেশাদারত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এখানেই বদলে যাওয়া পুলিশিংয়ের মূল দর্শনটি স্পষ্ট—শুধু অপরাধ দমন নয়, জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করাও পুলিশের দায়িত্ব। ফলে মাঠপর্যায়ের একজন এএসপির আচরণ, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব পালনের ধরনই ভবিষ্যতে পুলিশের ভাবমূর্তি গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে।
জনআস্থা অর্জনের অঙ্গীকার নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তাদের
অনুষ্ঠানে নবপদায়িত কয়েকজন কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে তাঁদের প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা পেশাদারত্ব বজায় রেখে জনগণকে সেবা দেওয়ার মাধ্যমে জনআস্থা অর্জনের অঙ্গীকার করেন। সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেনও জাতির প্রত্যাশা পূরণে দায়িত্ব পালনের জন্য নবীন কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত আইজি (অর্থ) মো. আকরাম হোসেন, অতিরিক্ত আইজি (এইচআরএম) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত আইজি (ডেভেলপমেন্ট) সরদার নূরুল আমিন, অতিরিক্ত আইজি (লজিস্টিকস অ্যান্ড অ্যাসেট অ্যাকুইজিশন) মো. মুশফেকুর রহমান, অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সায়েদুর রহমান, অতিরিক্ত আইজি (অডিট অ্যান্ড ইন্সপেকশন) ও নবগঠিত সাইবার পুলিশ ইউনিটের প্রধান মো. ইকবাল হোসেন এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডিআইজি (প্রশাসন) মো. হুমায়ুন কবীর।
৭২ কর্মকর্তার কাঁধে নতুন দায়িত্ব
৪৩তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচে মোট ৭২ জন কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৬ জন পুরুষ এবং ৬ জন নারী। এই ৭২ কর্মকর্তাই এখন মাঠপর্যায়ে পুলিশের নতুন মুখ। নিজেদের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, মানবিক আচরণ এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দৃঢ়তার মাধ্যমেই আইজিপির দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবে প্রতিফলন ঘটাবেন তাঁরাই। পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় পুলিশকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে। ফলে নতুন এএসপিদের সামনে দায়িত্ব কেবল একটি সরকারি পদে যোগ দেওয়া নয়। এটি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতের একটি পেশাদার, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক পুলিশিং সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়া। বর্তমান আইজিপি তাই তাদেরকে বাহিনীর একজন অ্যাম্বাসেডর হিসেবে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
কালের আলো/এমএএএমকে

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৮:৫৪ অপরাহ্ণ