মেধার মুকুটে ওসমানী স্বর্ণপদক; উচ্চমানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে গুরুত্ব বিমান বাহিনী প্রধানের

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৯:০৯ অপরাহ্ণ

আকাশের সীমানা যেখানে শেষ, দায়িত্বের সীমানা সেখানে শেষ নয় যেন! একটি বিমানকে আকাশে তুলে নেওয়ার জন্য যেমন প্রয়োজন নিখুঁত দক্ষতা, তেমনি একটি বাহিনীকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন জ্ঞান, শৃঙ্খলা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। সেই নেতৃত্বের ভিত গড়ে ওঠে একাডেমিক উৎকর্ষের মধ্য দিয়েই। আর সেই উৎকর্ষের স্বীকৃতি হিসেবে যশোরের বাংলাদেশ বিমান বাহিনী একাডেমিতে (বাফা) উঠল ওসমানী স্বর্ণপদকের দীপ্তি।

বিএসসি (অনার্স) ইন অ্যারোনটিক্স ও বিবিএ প্রোগ্রামে সর্বোচ্চ একাডেমিক কৃতিত্বের জন্য ৮১, ৮২, ৮৩, ৮৪, ৮৫ ও ৮৬ বাফা কোর্সের কর্মকর্তাদের বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) ওসমানী স্বর্ণপদক ও সনদপত্র প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের হাতে পদক ও সনদ তুলে দেন বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।

স্বর্ণপদকের আড়ালে যে বড় প্রত্যাশা
এটি কেবলমাত্র পুরস্কার বিতরণের আয়োজন নয়। সামরিক পেশায় একাডেমিক উৎকর্ষের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ দায়িত্বের জন্য সক্ষমতার স্বীকৃতিও। কারণ একজন কর্মকর্তার জ্ঞান যত গভীর হয়, পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষমতা তত শাণিত হয়; আর সেই বিশ্লেষণই সংকটমুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি করে। পুরস্কারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন বলেন, ‘একাডেমিক উৎকর্ষতা একজন কর্মকর্তার পেশাগত জীবনের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।’

  • একাডেমিক উৎকর্ষের স্বীকৃতি পেলেন ছয় কোর্সের কর্মকর্তারা
  • বিএসসি (অনার্স) ইন অ্যারোনটিক্স ও বিবিএতে সর্বোচ্চ কৃতিত্বের স্বীকৃতি
  • অর্জিত জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের তাগিদ; ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জে দক্ষ নেতৃত্ব গড়ার বার্তা

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একাডেমিক সাফল্যকে ব্যক্তিগত অর্জনের গণ্ডি পেরিয়ে পেশাগত উৎকর্ষের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বিমান বাহিনীর মতো প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে আধুনিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী সক্ষমতা ও বাস্তব প্রয়োগের দক্ষতা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত।

‘জ্ঞানার্জনের কোনো শেষ নেই’ 
বিমান বাহিনী প্রধান বলেন, ‘জ্ঞানার্জনের কোনো শেষ নেই।’ অর্জিত জ্ঞান সময়ের সঙ্গে প্রজ্ঞায় রূপ নেয় এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে একজন কর্মকর্তার পেশাগত বিকাশের দীর্ঘ পথের নির্দেশনা। একাডেমির পাঠ শেষ হলেও শেখার পর্ব শেষ হয় না। বরং কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা, নতুন প্রযুক্তি, পরিবর্তিত কৌশল ও বাস্তব পরিস্থিতি একজন কর্মকর্তার জ্ঞানের পরিধিকে ক্রমাগত বিস্তৃত করে। সামরিক বিশ্লেষকরাও মনে করেন, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এক বিষয় নয়। জ্ঞান মানুষকে জানায়; প্রজ্ঞা তাকে বোঝায় কখন, কোথায় এবং কীভাবে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে হবে। সামরিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয় সীমিত সময়ের মধ্যে, যেখানে ভুলের মূল্য হতে পারে অনেক বড়।

অর্জিত জ্ঞান কর্মজীবনে যথাযথভাবে প্রয়োগের আহ্বান 
তরুণ কর্মকর্তাদের সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার পাশাপাশি অর্জিত জ্ঞান কর্মজীবনে যথাযথভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানান বিমান বাহিনী প্রধান। মূলত এখানেই একাডেমিক সাফল্যের পরবর্তী অধ্যায়। শ্রেণিকক্ষের জ্ঞান যখন অপারেশনাল সিদ্ধান্তে, সমস্যা সমাধানে কিংবা নেতৃত্বের প্রয়োগে দৃশ্যমান হয়, তখনই তার পূর্ণ সার্থকতা আসে। সততার ওপর তাঁর গুরুত্বারোপও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সামরিক নেতৃত্বে দক্ষতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্যতা। একজন কর্মকর্তার পেশাগত সিদ্ধান্ত তখনই কার্যকর হয়, যখন তাঁর অধীনস্থ ও সহকর্মীরা তাঁর সক্ষমতা এবং নৈতিক অবস্থান—দুটির ওপরই আস্থা রাখতে পারেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

দায়িত্বের পরিধি এখন আকাশের চেয়েও বিস্তৃত
বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিমান বাহিনীর দায়িত্ব শুধু আকাশসীমা পাহারা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং জাতীয় প্রয়োজনে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও এর দায়িত্বের অংশ। তিনি বিমান বাহিনীর বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানবিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।’

ভবিষ্যতের লড়াই শুরু হয় প্রশিক্ষণকক্ষেই
বিমান বাহিনী প্রধান বলেন, এসব দায়িত্ব পালনে উচ্চমানের প্রশিক্ষণ, কঠোর শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব অপরিহার্য। ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে তিনি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা বাস্তবতার ক্রমাগত রূপান্তর সামরিক বাহিনীর

সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অস্ত্র ও প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। আর সেই মানবসম্পদ তৈরির প্রথম কারখানা হলো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। এই বাস্তবতায় বাফার একাডেমিক অনুষ্ঠানকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের পথ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাগত প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

পদক হাতে, সামনে বড় পরীক্ষাও
সমানী স্বর্ণপদক মেধার স্বীকৃতি। কিন্তু সামরিক জীবনে এটি একই সঙ্গে একটি নতুন প্রত্যাশার সূচনা। কারণ একাডেমিক উৎকর্ষের প্রমাণ দেওয়ার পর এবার সেই জ্ঞানকে বাস্তব দায়িত্বে প্রমাণ করার পালা। বিমান বাহিনী প্রধানের বক্তব্যের সারকথা তাই এক জায়গায় এসে মেলে—শিখতে হবে অবিরাম, অর্জিত জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় রূপ দিতে হবে এবং সেই প্রজ্ঞাকে কাজে লাগাতে হবে সঠিক সিদ্ধান্তে। সততা, দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বকে ধারণ করে গড়ে তুলতে হবে এমন নেতৃত্ব, যে নেতৃত্ব সংকটে পথ দেখাবে এবং দায়িত্বের মুহূর্তে আস্থা তৈরি করবে। বাফার মঞ্চে এদিন যে স্বর্ণপদক ঝলমল করেছে, তার আসল মূল্য তাই ধাতুর দীপ্তিতে নয়—আগামী দিনের দায়িত্বে সেই মেধা, জ্ঞান ও নেতৃত্ব কতটা আলো ছড়ায়, তার ওপর।

অনুষ্ঠানে সহকারী বিমান বাহিনী প্রধান (পরিচালন) এয়ার ভাইস মার্শাল রুশাদ দ্বীন আসাদ, সহকারী বিমান বাহিনী প্রধান (প্রশাসন) এয়ার ভাইস মার্শাল মোহাম্মদ খাইরুল আফসার, অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ (এএইউবি) ভাইস চ্যান্সেলর এয়ার ভাইস মার্শাল এম. মুস্তাফিজুর রহমান, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের এয়ার অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল এ.এফ.এম শামীমুল ইসলাম, এয়ার ট্রেনিং এন্ড ডকট্রিন কমান্ডের কমান্ড্যান্ট এয়ার ভাইস মার্শাল আসাদুল করিম, ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও যশোরের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মো. হাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিমান বাহিনী একাডেমির কমান্ড্যান্ট এবং বিমান সদর ও ঘাঁটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এমএএএমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন