একসময় ফিলিস্তিনের অন্যতম দৃঢ় সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল ভারত। ঔপনিবেশিকতাবিরোধী অবস্থান, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে দীর্ঘদিন সরব ছিল নয়াদিল্লি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই অবস্থান। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশ্য, ঘনিষ্ঠ ও কৌশলগত।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনির প্রাণহানি এবং নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও সেই সম্পর্কের গভীরতা কমেনি। বরং অস্ত্র, প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আল–জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল যখন ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে, তখন ভারত তার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার পরিবর্তে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নিরাপত্তাগত হিসাব-নিকাশ এবং দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির মিল।
নিষেধাজ্ঞার মুখে ইসরায়েলি মন্ত্রী, ভারতে উষ্ণ অভ্যর্থনা
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ ভারত সফরে আসেন। গাজায় ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার পক্ষে বক্তব্য এবং অধিকৃত পশ্চিম তীর ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার অবস্থানের কারণে এর আগে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও নরওয়ের মতো দেশ তার প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও স্মোতরিচ ও ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিয়েছিল।
কিন্তু একই সময়ে ভারতে স্মোতরিচকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। সফরে তিনি বাণিজ্যিক চুক্তি করেন, মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জ পরিদর্শন করেন এবং গুজরাটে একটি বিনিয়োগকেন্দ্র ঘুরে দেখেন।
আল–জাজিরার বিশ্লেষণে এই সফরকে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যখন পশ্চিমা কয়েকটি দেশ ইসরায়েলি সরকারের কট্টরপন্থী নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছিল, তখন ভারত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখে।
৭ অক্টোবরের হামলার পর বদলে যায় সুর
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘটনাটির নিন্দা জানান। হামলাকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ আখ্যা দিয়ে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হওয়ার কথা বলেন।
এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হয়। ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক প্রাণহানি, আবাসিক এলাকা ধ্বংস এবং মানবিক সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়। ইসরায়েলি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও ওঠে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
তবু ভারতের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। নয়াদিল্লি একদিকে কূটনীতি, সংলাপ ও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছে; অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও এগিয়ে নিয়েছে।
আল–জাজিরার অনুসন্ধান ও অন্যান্য প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধ চলাকালেও ভারত থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির ঘটনা সামনে এসেছে। মোদির আমলে ইসরায়েল ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার হয়ে উঠেছে।
মোদির রাজনীতির সঙ্গে ইসরায়েল-সম্পর্কের যোগসূত্র
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতার ব্যাখ্যা কেবল প্রতিরক্ষা বা কূটনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শন এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও নিরাপত্তানীতির প্রতি সমর্থনকারী ভারতীয় ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
নয়াদিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াইয়ের মতে, বিজেপির রাজনৈতিক বয়ানে ইসলামি উগ্রবাদ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। তার ব্যাখ্যায়, ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের ডানপন্থী মহলের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতিকে সমর্থন করে আসছে। কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ইসরায়েলের মতো কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান উঠেছে।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, শুধু আদর্শিক মিল দিয়ে এই সম্পর্কের পুরো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবও ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
‘গোপন সম্পর্ক’ থেকে প্রকাশ্য অংশীদারত্ব
ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ভারত দেশটির বিরোধিতা করেছিল। ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও ঔপনিবেশিকতাবিরোধী অবস্থানের কারণে নয়াদিল্লি দীর্ঘ সময় ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেয়।
১৯৭৪ সালে ভারত ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থাকে (পিএলও) স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে জায়নবাদকে বর্ণবাদের একটি রূপ হিসেবে চিহ্নিত করা প্রস্তাবের পক্ষেও ভোট দেয় ভারত। পরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর মধ্যেও ছিল নয়াদিল্লি।
তবে একই সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের গোপন যোগাযোগ ও সহযোগিতার সম্পর্কও গড়ে ওঠে। ১৯৯২ সালে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর বিভিন্ন ভারতীয় সরকার সেই সম্পর্ককে ধীরে ধীরে বিস্তৃত করেছে।
২০১৭ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আর আড়ালে থাকেনি; বরং প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের রূপ পায়।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক নবদ্বীপ সুরির মতে, মোদির আমলে দুই দেশের সম্পর্কের একটি বড় পরিবর্তন হলো—আগে যে সহযোগিতা অনেকাংশে আড়ালে থাকত, এখন তা প্রকাশ্যে এসেছে।
প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বড় কারণ
ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। সামরিক প্রযুক্তি, নজরদারি ব্যবস্থা, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মতো ক্ষেত্র দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে।
সাবেক কূটনীতিক নবদ্বীপ সুরি মনে করেন, নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে বাস্তব মিল রয়েছে। নয়াদিল্লি ইসরায়েলকে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে।
এই বাস্তবতা ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থাকলেও প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে সরে আসার তেমন আগ্রহ নয়াদিল্লির মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
ইউরোপের অবস্থান বদলালেও ভারত অনড়
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ক্রমে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কিছু দেশ ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কট্টর ডানপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রী ও সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
অন্যদিকে ভারত মূলত বিবৃতি, মানবিক সহায়তার আহ্বান এবং কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক কমানোর মতো বড় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
সাবেক কূটনীতিক সুরির মতে, ভারতের আরও নীতিনিষ্ঠ অবস্থান নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে দুই দেশের সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়ে ঘনিষ্ঠতার কারণে ইসরায়েলের সমালোচনা করতে নয়াদিল্লির অনীহা দেখা যায় বলেও তিনি মনে করেন।
এই পার্থক্য ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে ঘিরে একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে নীতিগত অবস্থান, নাকি প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত স্বার্থ—কোনটি নয়াদিল্লির সিদ্ধান্তে বেশি প্রভাব ফেলছে?
মোদির ইসরায়েল সফর ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সুবিধা
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদির ইসরায়েল সফর দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে চাপ ও সমালোচনা চলার মধ্যেই এই সফর অনুষ্ঠিত হয়।
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু মোদিকে ইসরায়েলের ‘মহান বন্ধু’ এবং ‘ভাই’ বলে অভিহিত করেন। সফরের মাধ্যমে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা আবারও প্রকাশ্যে আসে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন কর্মসূচির পরিচালক ম্যাক্স রোডেনবেকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোদির এই সফর নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করেছিল।
অতীতে কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থন কল্পনা করা কঠিন ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক দুই দেশের নেতৃত্বের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়েছে।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারতের সামনে কঠিন পরীক্ষা
ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান সমর্থন করে। ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, সংঘাতের অবসান এবং কূটনৈতিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছে নয়াদিল্লি।
কিন্তু এসব অবস্থানের পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা অব্যাহত থাকায় ভারতের নীতির মধ্যে একটি স্পষ্ট টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে।
একদিকে ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সমর্থনের ঘোষণা, অন্যদিকে গাজা যুদ্ধের মধ্যেও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা—এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আল–জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ভারতের এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আদর্শ, নিরাপত্তাগত বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ভারত কেন ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, তা নয়; বরং ফিলিস্তিনের প্রতি ঐতিহাসিক সমর্থন বজায় রাখার দাবি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পর্ক—এই দুইয়ের মধ্যে নয়াদিল্লি কীভাবে সামঞ্জস্য তৈরি করবে।
কালের আলো/জেএন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ