বিশ্বজুড়ে নতুন মহামারির আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই রাশিয়ায় প্লেগের সম্ভাব্য সংক্রমণ ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য। সাইবেরিয়ায় প্লেগ নিয়ে কাজ করা একটি গবেষণাগারের ২৮ বছর বয়সী নারী কর্মীর রহস্যজনক নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর পর হাসপাতালের কর্মী, রোগী ও তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট গবেষণাগারও। তবে ওই নারীর মৃত্যুর কারণ প্লেগ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—রাশিয়ায় কি সত্যিই নতুন করে প্লেগ ছড়াচ্ছে, নাকি সীমিত একটি ঘটনাকে ঘিরে বাড়ছে আতঙ্ক?
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ইরকুতস্কে অবস্থিত সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যবিষয়ক অ্যান্টিপ্লেগ ইনস্টিটিউটে ল্যাব টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করতেন দারিয়া শিপিলোভা। চলতি মাসের শুরুতে ‘রহস্যজনক নিউমোনিয়া’য় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এবং সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে রুশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
গবেষণাগারে কর্মীর মৃত্যু ঘিরে রহস্য
দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যুর পর তাঁকে যে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, সেখানকার কর্মী ও রোগীদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষণাগারের অন্য কর্মী এবং তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগের বড় কারণ, ওই নারী এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, যেখানে প্লেগের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা করা হয়। এ ধরনের গবেষণাগারে জীবাণু যেন বাইরে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য সাধারণত কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারিবিশেষজ্ঞ জেনিফার নুজ্জো নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, এ ঘটনার কিছু বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়। তাঁর মতে, গবেষণাগারে কাজের সময় যথাযথ সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার এবং জীবাণুর সংস্পর্শে আসার পর দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা পেলে ওই কর্মীর প্রাণঘাতী সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা কঠিন।
প্লেগ কি এখনো মানুষের জন্য হুমকি?
প্লেগ কোনো নতুন রোগ নয়। ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস নামের ব্যাকটেরিয়ার কারণে এ রোগ হয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এই ব্যাকটেরিয়া ভয়াবহ মহামারির জন্ম দিয়েছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এ মহাদেশটির অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
তবে প্লেগ এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েক শ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হন। মাদাগাস্কার ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি সংক্রমণের ঘটনা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশেও বিচ্ছিন্নভাবে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
সাধারণত সংক্রমিত মাছির কামড় অথবা আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে এ রোগ মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে। তবে রোগের ধরন অনুযায়ী সংক্রমণের প্রক্রিয়া ও ঝুঁকি ভিন্ন হয়।
প্লেগের তিন ধরন, সবচেয়ে বিপজ্জনক কোনটি?
প্লেগের প্রধান তিনটি ধরন রয়েছে—বিউবনিক, সেপ্টিসেমিক ও নিউমোনিক।
বিউবনিক প্লেগ: সংক্রমণের এই ধরনে ব্যাকটেরিয়া লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত সংক্রমিত মাছির কামড়ের মাধ্যমে এ রোগ হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়া, জ্বর ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
সেপ্টিসেমিক প্লেগ: ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়লে এ ধরনের প্লেগ হয়। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
নিউমোনিক প্লেগ: প্লেগের সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরনগুলোর একটি এটি। এ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে নির্গত সংক্রামক ক্ষুদ্র কণার সাহায্যে অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে পারে।
দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যুকে ঘিরে উদ্বেগের একটি কারণ হলো, তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে নিউমোনিয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে নিউমোনিয়া হলেই সেটি প্লেগ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফল ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য।
রাশিয়ার নীরবতায় বাড়ছে উদ্বেগ
ঘটনার পর রুশ কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য না থাকায় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। গবেষণাগারে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছিল কি না, ওই নারী কীভাবে অসুস্থ হলেন এবং তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্য কেউ আক্রান্ত হয়েছেন কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্যের অভাব উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতার কারণে নতুন কোনো সংক্রামক রোগের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে বিশ্বজুড়ে সতর্কতা বেড়েছে। বিশেষ করে রোগের উৎস, সংক্রমণের ধরন ও আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য দেরিতে প্রকাশিত হলে সন্দেহ ও গুজব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বুধবার বলেন, এ বিষয়ে রাশিয়ার আরও বিস্তারিত তথ্য জানানো উচিত। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
অন্যদিকে, রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দারিয়া শিপিলোভাকে প্লেগের টিকা দেওয়া হয়েছিল এবং গবেষণাগারে কোনো জরুরি পরিস্থিতি শনাক্ত হয়নি। দেশটির স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্য, ইরকুতস্ক শহর ও আশপাশের অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য মহামারির কোনো ঝুঁকি নেই।
তবে ওই নারীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং গবেষণাগারে সংক্রমণের কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
টিকা ও চিকিৎসা কতটা কার্যকর?
প্লেগের ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং যথাযথ চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা না করা হলে বিশেষ করে নিউমোনিক প্লেগ দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তবে সময়মতো অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে এ রোগের চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে।
প্লেগের টিকা নিয়েও কিছু প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত বা উপলভ্য টিকা সব ধরনের প্লেগের বিরুদ্ধে কতটা সুরক্ষা দেয়, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য সীমিত। তাই টিকা নেওয়ার তথ্য থাকলেও তা দিয়ে সংক্রমণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
প্লেগ কি জৈবিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল?
ইতিহাসে প্লেগের জীবাণুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ও বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, চতুর্দশ শতাব্দীতে মঙ্গোল বাহিনী ক্রিমিয়ার কাফা শহরে প্লেগে আক্রান্ত মানুষের মরদেহ নিক্ষেপ করেছিল। তবে এ ঘটনার সঙ্গে ইউরোপে ব্ল্যাক ডেথ ছড়িয়ে পড়ার সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও মহামারিবিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের জৈবিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে পালিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তির দাবি ছিল, তৎকালীন সরকার গুটিবসন্ত ও প্লেগের জীবাণু মজুত করেছিল। তবে এসব দাবি কয়েক দশক আগের ঘটনা নিয়ে, বর্তমান রাশিয়ার গবেষণাগারে কী ঘটেছে তার প্রমাণ নয়।
তাহলে কি নতুন মহামারির আশঙ্কা রয়েছে?
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাশিয়ায় প্লেগের ব্যাপক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যুর কারণ প্লেগ বলে নিশ্চিত হলেও, তাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয় না।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মূল জায়গা হলো ঘটনার অস্পষ্টতা, গবেষণাগারের নিরাপত্তা এবং রুশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্যের অভাব। একই সঙ্গে প্লেগের মতো রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্ত ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
সুতরাং, আপাতত আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত। মৃত্যুর কারণ, সম্ভাব্য সংক্রমণের উৎস এবং কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির প্রকৃত ঝুঁকি আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে।
কালের আলো/জেএন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:১১ পূর্বাহ্ণ