দেশের আবাসন খাতে স্থবিরতার প্রভাব শুধু ফ্ল্যাট কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ খাতের গতি কমে গেলে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, কাচ, আসবাবপত্র ও পরিবহনশিল্পসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রভাব পড়তে পারে নির্মাণশ্রমিকদের কর্মসংস্থান, ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম এবং সামগ্রিক বিনিয়োগে।
বর্তমানে বাংলাদেশের আবাসন বাজারে চাহিদা থাকলেও ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ সুদের হার, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কর ও নিবন্ধন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নিতে অনেকেই অপেক্ষা করছেন। অন্যদিকে, নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সতর্কতা বাড়ছে।
একটি আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকে বহু শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। রড আসে ইস্পাত কারখানা থেকে, সিমেন্ট আসে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইট, বালু, পাথর, টাইলস, স্যানিটারি পণ্য, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, রং, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও লিফটের মতো পণ্য।
এসব উপকরণ পরিবহনে যুক্ত থাকে ট্রাকমালিক, চালক ও বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠান। ফলে নতুন ভবন নির্মাণ কমে গেলে নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা কমার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চাহিদা কমে গেলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো কারখানার পক্ষে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট সরবরাহকারী ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের ওপরও পড়তে পারে।
আবাসন খাতে প্রকৌশলী, স্থপতি, রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, টাইলস মিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি ও নির্মাণশ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ কাজ করেন।
নির্মাণকাজ কমে গেলে এসব মানুষের কাজ ও আয় কমার আশঙ্কা থাকে। আয় কমলে তাঁদের দৈনন্দিন ব্যয়ও সংকুচিত হতে পারে। এতে স্থানীয় দোকানপাট, বাজার, পরিবহন ও সেবামূলক ব্যবসায়ও প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ, একটি আবাসন প্রকল্পের কাজ কমে যাওয়ার প্রভাব সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের পরিবার ছাড়িয়ে তাঁদের ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য ব্যবসাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আবাসন খাতের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই গৃহঋণের সহায়তায় ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ঋণের সুদের হার বাড়লে মাসিক কিস্তির পরিমাণও বেড়ে যায়। এতে সম্ভাব্য ক্রেতাদের অনেকে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন।
একজন ক্রেতা গৃহঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কিনলে সেই অর্থ ডেভেলপারের কাছে যায়। ডেভেলপার নির্মাণকাজে অর্থ ব্যয় করেন, যা শ্রমিক, ঠিকাদার ও নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারীদের কাছে পৌঁছায়। এভাবে আবাসন বিনিয়োগ অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে অর্থের প্রবাহ তৈরি করে।
ফ্ল্যাট বিক্রি কমে গেলে এ প্রবাহও দুর্বল হতে পারে। ফলে আবাসন ব্যবসার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতগুলোও চাপে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
নতুন ফ্ল্যাটে ওঠার পর একটি পরিবারের আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিকস, গৃহসজ্জার সামগ্রী, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজন হয়। এতে আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তিসেবা ও গৃহসজ্জাসামগ্রীর বাজারে চাহিদা তৈরি হয়।
তাই আবাসন খাতের প্রভাব শুধু ভবন নির্মাণ বা ফ্ল্যাট বিক্রিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ভোক্তাপণ্য ও বিভিন্ন সেবামূলক ব্যবসারও সম্পর্ক রয়েছে।
আবাসন খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ক্রেতার সক্ষমতা, নির্মাণ ব্যয়, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী গৃহঋণের সুযোগ বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি আবাসন অর্থায়নব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং কর ও নিবন্ধন ব্যয়ের কাঠামো পর্যালোচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা এবং জমি ও প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, সহজ ও সময়সাশ্রয়ী করা জরুরি।
আবাসন ব্যবসা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর হওয়ায় নীতির ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ার পাশাপাশি নতুন প্রকল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আবাসন বাজারে স্থবিরতার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে ফ্ল্যাট বিক্রি, নতুন প্রকল্প, নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা, গৃহঋণ বিতরণ ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
আবাসন খাতের সঙ্গে রড ও সিমেন্টশিল্প, নির্মাণশ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকের ঋণ, আসবাবপত্র, সিরামিক, কাচ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও পরিবহনশিল্পের সরাসরি বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
এ খাতের গতি কমে গেলে সংশ্লিষ্ট শিল্প ও ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিপরীতে, আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়ালে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তাই আবাসন খাতকে সচল রাখা শুধু ফ্ল্যাটের বাজার চাঙা করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু শিল্পের উৎপাদন, মানুষের আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির গতিশীলতা।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:২৫ অপরাহ্ণ