সোনার পথ বদলেছে, বদলেছে পাচারের ছক

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:৩৪ অপরাহ্ণ

সোনার চোরাচালানে এখন আর শুধু বার, বিস্কুট কিংবা কোমরে বাঁধা প্যাকেটের ওপর নির্ভর করছে না পাচারকারীরা। ধরা পড়ার ঝুঁকি কমাতে বদলে যাচ্ছে কৌশল, বদলাচ্ছে সোনার আকৃতি ও লুকানোর জায়গা। কখনো পেস্ট বানিয়ে পায়ুপথে, কখনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কাপড়ে মিশিয়ে, আবার কখনো বিমানকর্মীর জুতার ভেতর ঢুকিয়ে আনা হচ্ছে সোনা। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সর্বশেষ উদ্ধার হওয়া ১ হাজার ২৯০ গ্রাম সোনার পেস্ট সেই বদলে যাওয়া কৌশলেরই নতুন উদাহরণ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সোনা উদ্ধারের তথ্য জানায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ওইদিন সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে আসা এয়ার অ্যারাবিয়ার একটি ফ্লাইটে সোনা চোরাচালানের গোপন তথ্য পায় ঢাকা কাস্টম হাউস। এর ভিত্তিতে বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে নজরদারি শুরু করেন সংস্থাটির গোয়েন্দারা।

  • পায়ুপথে ডিম্বাকৃতির পেস্ট, জুতায় ৮০ বার
  • পোশাকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়ও চালান
  • নতুন কৌশলে চোরাচালানের বিস্তার

একপর্যায়ে ওই ফ্লাইটে আসা আরমান উদ্দীন সিদ্দিক নামের এক যাত্রী ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম শেষ করে ব্যাগেজ বেল্ট-২-এ এলে তাঁকে সন্দেহের ভিত্তিতে তল্লাশি করা হয়। এ সময় তাঁর পায়ুপথে বিশেষভাবে লুকানো সাদা স্কচটেপে মোড়ানো ডিম্বাকৃতির তিনটি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। প্যাকেটগুলোর ভেতরে ছিল সোনার পেস্ট।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি প্যাকেটে ৪৩০ গ্রাম করে মোট ১ হাজার ২৯০ গ্রাম সোনার পেস্ট ছিল। সোনার বিশুদ্ধতা ২৪ ক্যারেট। পেস্টগুলো পরিশোধনের পর আনুমানিক এক কেজি সোনা পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এ ঘটনায় ওই যাত্রীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছে ঢাকা কাস্টম হাউস।

বার থেকে পেস্ট, বদলাচ্ছে কৌশল
শাহজালালে সোনা আটকের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—চোরাচালানকারীরা প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে সোনা বহনের নতুন নতুন কৌশল খুঁজছে। কখনো সোনা আনা হচ্ছে বার বা বিস্কুট আকারে, আবার কখনো গলিয়ে পেস্ট কিংবা গুঁড়ায় রূপান্তর করা হচ্ছে। পোশাকের সঙ্গে রাসায়নিকভাবে মিশিয়ে আনার ঘটনাও ঘটেছে।

এই কৌশল পরিবর্তনের পেছনে মূল লক্ষ্য তল্লাশি এড়িয়ে চালান গন্তব্যে পৌঁছানো। সোনার প্রচলিত আকৃতি বদলে ফেললে সাধারণ তল্লাশিতে তা শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। ফলে চোরাচালান প্রতিরোধে শুধু ধাতব বস্তু শনাক্তের প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে ঝুঁকিভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

গত বছর এপ্রিলেও দুবাই থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় আসা এক যাত্রীর পোশাক থেকে সোনার মতো গুঁড়া উদ্ধার করা হয়েছিল। চার জোড়া অন্তর্বাস, একটি প্যান্ট ও তিনটি টি-শার্টে ওই পদার্থ লুকানো ছিল। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিশোধনের পর সেখান থেকে প্রায় ২ কেজি ৪১৭ গ্রাম সোনা পাওয়া যায়।

জুতার ভেতর ৯ কেজির বেশি সোনা
চোরাচালানে শুধু সাধারণ যাত্রী নয়, বিমানকর্মীদেরও ব্যবহার করার নজির রয়েছে। ঢাকা কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, দুবাই থেকে আসা এমিরেটসের একটি ফ্লাইটের দুই বিমানকর্মীর জুতার ভেতর থেকে ৮০টি সোনার বার (০৪ অক্টোবর) উদ্ধার করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)।

বারগুলোর মোট ওজন ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি। আনুমানিক বাজারমূল্য ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বিশেষ কায়দায় জুতার ভেতরে বারগুলো লুকানো হয়েছিল। এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, বিমানবন্দরে চোরাচালানের ঝুঁকি শুধু বহিরাগত যাত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উড়োজাহাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদেরও ব্যবহার করার চেষ্টা করছে চোরাচালানকারীরা। ফলে নিরাপত্তা ও নজরদারির আওতা শুধু যাত্রী তল্লাশিতে সীমাবদ্ধ রাখলে ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।

টয়লেট-সিটের নিচেও চালান
সোনা উদ্ধারের ঘটনাগুলোর আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। সব ক্ষেত্রে বাহকের শরীর বা লাগেজে সোনা পাওয়া যাচ্ছে না। কখনো উড়োজাহাজের টয়লেট, কখনো সিটের নিচের অংশ, আবার কখনো বিমানবন্দরের ভেতরের নির্দিষ্ট স্থানে সোনা রেখে যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।

এতে বোঝা যায়, চোরাচালান শুধু একজন বাহকের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং নির্দিষ্ট রুট, সহযোগী এবং বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে চালান পরিচালনার চেষ্টা থাকতে পারে। তাই যাত্রী তল্লাশির পাশাপাশি উড়োজাহাজ, বিমানকর্মী ও বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

গোপন তথ্যই বড় চালান ধরার চাবি
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে গোপন তথ্য ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারির গুরুত্বও স্পষ্ট। সর্বশেষ সোনার পেস্ট উদ্ধারের ক্ষেত্রেও আগাম তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে নজরদারি শুরু করেছিল ঢাকা কাস্টম হাউসের গোয়েন্দারা।

বিপুলসংখ্যক যাত্রীর মধ্য থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে ভ্রমণপথ, আচরণ, লাগেজের ধরন ও পূর্ববর্তী তথ্য বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও তথ্য বিনিময় বাড়ানো গেলে চোরাচালানের নতুন কৌশল শনাক্ত করার সুযোগও বাড়বে।

উদ্ধার বাড়ছে, প্রশ্ন থাকছে নেটওয়ার্ক নিয়ে
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে ৫৩ দশমিক ৭২৭ কেজি সোনা উদ্ধার হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধার হয়েছে।

তবে একটি চালান আটক করাই চোরাচালান বন্ধের শেষ কথা নয়। একটি চালান ধরা পড়ার পর একই চক্র নতুন পদ্ধতিতে আবার চেষ্টা করছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফলে উদ্ধার হওয়া সোনার পরিমাণের পাশাপাশি চোরাচালানের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, অর্থের উৎস খুঁজে বের করা এবং দেশে-বিদেশে জড়িত সহযোগীদের চিহ্নিত করাও জরুরি।

নতুন কৌশলের বিপরীতে নজরদারি
ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান সর্বশেষ ঘটনাটিকে ব্যতিক্রমী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে সোনার বার, বিস্কুট ও জামাকাপড়ে লুকানো সোনা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

চোরাচালানকারীরা যখন সোনার আকৃতি ও বহনের পদ্ধতি বদলাচ্ছে, তখন নজরদারির কৌশলও সেই অনুযায়ী বদলানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সর্বশেষ পায়ুপথে ডিম্বাকৃতির সোনার পেস্ট উদ্ধারের ঘটনা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।

শাহজালালে উদ্ধার হওয়া ১ হাজার ২৯০ গ্রাম সোনা তাই শুধু একটি চালান আটকের ঘটনা নয়। এটি দেখাচ্ছে, চোরাচালানের কৌশল ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে একটি পদ্ধতি বন্ধ হওয়ার পর আরেকটি পদ্ধতি সামনে আসার আগেই তা শনাক্ত করতে হলে বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় আরও সমন্বিত, তথ্যনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি প্রয়োজন।

কালের আলো/জিএন/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন