মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষকদের প্রায় এক দশকের গবেষণায় বর্জ্য থেকে জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে। এবার গবেষণাটিকে পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে বৃহত্তর পরিসরে নেওয়ার উদ্যোগে সরকারের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ প্রযুক্তির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গবেষকেরা তাঁদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, গবেষণার ফলাফল এবং দেশে বাণিজ্যিকভাবে জ্বালানি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। প্রকল্পটির সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
- মানববর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে বায়োক্রুড উৎপাদনে কুয়েটের অগ্রগতি
- আমদানিনির্ভর তেলের ১০–১৫ শতাংশ প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা
বর্জ্য থেকে তেল, গবেষণায় সাফল্য কতটা?
প্রকল্পটির মূল গবেষক কুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীকে গবেষণার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত করেন। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, প্রায় ১০ বছর ধরে পরিচালিত এ গবেষণায় ‘হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্য থেকে বায়োক্রুড উৎপাদনে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।এ প্রযুক্তিতে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের মধ্যে পানি উপস্থিত রেখে জৈব পদার্থকে তরল জ্বালানির উপযোগী উপাদানে রূপান্তর করা হয়। গবেষণাগারের পরীক্ষায় ইতোমধ্যে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বায়োক্রুড উৎপাদনের ফল পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ডিজেলসমৃদ্ধ বায়োক্রুড উৎপাদনেও সাফল্য এসেছে বলে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়।তবে গবেষণাগারে পাওয়া উৎপাদনের হার আর শিল্পকারখানায় লাভজনকভাবে জ্বালানি উৎপাদন এক বিষয় নয়। বর্জ্যের ধরন, আর্দ্রতা, প্রক্রিয়াকরণের খরচ, উৎপাদিত তেলের গুণমান এবং পরিশোধনের প্রয়োজনীয়তা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই প্রযুক্তিটির প্রকৃত বাণিজ্যিক সক্ষমতা নির্ধারণ করতে হবে।
১২০ কোটি টাকার পাইলট প্ল্যান্টের পরিকল্পনা
গবেষণার পরবর্তী ধাপে প্রতিদিন ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা।পাইলট প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির বাস্তব কার্যকারিতা, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানির গুণমান এবং বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। এ পর্যায়ে সফলতা পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব হবে।তবে প্রস্তাবিত প্ল্যান্টে দৈনিক ১ থেকে ৩ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা থাকলেও সেখান থেকে কত লিটার ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে বর্জ্যের গঠন, উৎপাদনের হার ও পরিশোধনপ্রক্রিয়ার ওপর। তাই প্রাথমিক উৎপাদন-তথ্যকে সরাসরি জাতীয় পর্যায়ের জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে তুলনা করার আগে আরও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
বছরে হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা
গবেষণাসংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। এতে বছরে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় উৎস থেকে বিকল্প তরল জ্বালানি উৎপাদন করতে পারলে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উল্লিখিত সাশ্রয়ের পরিমাণ এখনই নিশ্চিত অর্জন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি গবেষণাসংশ্লিষ্টদের দেওয়া সম্ভাব্য হিসাব। প্রযুক্তিটির উৎপাদনক্ষমতা, বাণিজ্যিক ব্যয়, পরিশোধন খরচ এবং প্রচলিত জ্বালানির সঙ্গে ব্যবহারের উপযোগিতা যাচাইয়ের পরই প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও সম্ভাবনা
এ উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। মানববর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশের যথাযথ ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এসব বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে মূল্যবান জ্বালানি উপাদানে রূপান্তর করা গেলে বর্জ্যের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশদূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।তবে এ সুবিধা নিশ্চিত করতে বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াকরণ এবং অবশিষ্ট পদার্থের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদিত বায়োক্রুডকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাবও যাচাই করতে হবে।
গবেষণায় সরকারি সহায়তার আশ্বাস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গবেষকদের উদ্ভাবিত প্রকল্পের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত শোনেন। প্রকল্পটির সম্ভাবনা বিবেচনায় এটি বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের এ উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় গবেষণা। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তব সুফলে রূপ দিতে পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষণাগারের সাফল্য বাণিজ্যিক উৎপাদনে রূপ নিতে পারলে তা একদিকে জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমাতে, অন্যদিকে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার নতুন পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
কালের আলো/এমএএএমকে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:২১ অপরাহ্ণ