অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণদের আবাসনের জন্য প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে তিনতলা আধুনিক ভবন। রয়েছে শয্যাকক্ষ, ডাইনিং, শরীরচর্চার সরঞ্জাম, স্বাস্থ্যসেবা কর্নার, লিফট, প্রার্থনা কক্ষ ও পাঠাগার। কিন্তু এত আয়োজনের পরও সেখানে ঠাঁই হয়নি একজন প্রবীণের। জনবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত না করায় উদ্বোধনের পর থেকে অব্যবহৃত পড়ে আছে লালমনিরহাটের সরকারি ‘শান্তিনিবাস’। বর্তমানে বিদ্যুৎহীন ও তালাবদ্ধ ভবনটিতে বিরাজ করছে সুনসান পরিবেশ।
লালমনিরহাট শহরের কলেজ রোড এলাকায় সরকারি শিশু পরিবারের (বালিকা) ক্যাম্পাসসংলগ্ন প্রায় ৩০ শতক জমিতে নির্মিত হয়েছে শান্তিনিবাস। বাইরে থেকে দৃষ্টিনন্দন ভবনটি নজর কাড়লেও ভেতরে জমেছে ধুলার আস্তর। অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে আসবাব, শরীরচর্চার যন্ত্রপাতি ও স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন সরঞ্জাম। প্রবীণদের জন্য নির্মিত ভবনটি এখন মাকড়সা ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের আবাসে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের সব কক্ষ তালাবদ্ধ। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পুরো ভবন কার্যত অচল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লিফট পরিচালনার চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো ও সরঞ্জাম কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
উদ্বোধন হলেও চালু হয়নি কার্যক্রম
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট শান্তিনিবাসের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী নূরুজ্জামান আহমেদ ভবনটির উদ্বোধন করেন। ২৫ জন ষাটোর্ধ্ব প্রবীণের আবাসনের উপযোগী করে নির্মিত এই ভবনে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
তবে উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় শুরু করা যায়নি কার্যক্রম। বর্তমানে লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ভবনটির দেখভাল করছে।
শান্তিনিবাসের দেখভালের দায়িত্বে থাকা সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা)-এর উপতত্ত্বাবধায়ক হাওয়া বেগম জানান, শিশু পরিবারের ক্যাম্পাসে ভবনটি নির্মিত হওয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তাঁকে এটি দেখভাল করতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় শান্তিনিবাস চালু করা সম্ভব হয়নি।
লালমনিরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল হক জানান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের আওতায় দেশের আটটি বিভাগে আটটি সরকারি শিশু পরিবারের অভ্যন্তরে শান্তিনিবাস নির্মাণ করা হয়েছে। এসব অবকাঠামোর নির্মাণকাজ ২০২৩ সালে শেষ হয়। রংপুর বিভাগের শান্তিনিবাসটি লালমনিরহাটে নির্মিত হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পদ সৃজনের পর জনবল নিয়োগের কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তদন্তের দাবি সচেতন মহলের
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) লালমনিরহাট জেলা সহসভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আবু হাসনাত রানা বলেন, জনগণের করের টাকায় নির্মিত ভবনটি কেন এখনো চালু করা হয়নি, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান জানান, শান্তিনিবাস চালু না হওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা রয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
প্রবীণদের নিরাপদ আশ্রয় ও সেবার জন্য নির্মিত শান্তিনিবাসটি কবে চালু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না হলে সরকারি অর্থে নির্মিত এই স্থাপনার সুফল থেকে বঞ্চিত হবেন অসহায় প্রবীণরা।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি