ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে খোদাবক্সপুরে ঘরহারা দেড় শতাধিক পরিবার

ময়মনসিংহ প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:০৬ অপরাহ্ণ

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভাঙনামারী ইউনিয়নের খোদাবক্সপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে মানুষের ঠিকানা। একের পর এক বসতভিটা ও কৃষিজমি নদে বিলীন হচ্ছে। ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে নদীতীরের বাসিন্দাদের। অনেক পরিবার ইতিমধ্যে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে, আবার অনেকের শেষ আশ্রয়টুকুও এখন ঝুঁকির মুখে।

নদের তীরে দাঁড়িয়ে সত্তরোর্ধ্ব আবদুল মান্নান নিজের জীবনের দীর্ঘ দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আর কত ভাঙব, আর কতবার বানামু? আমার সবই শেষ হইয়া গেছে। জীবনে চারবার বসতভিটা হারিয়েছি। নদে খাইছে ২০ একর জমি।’

সন্তানদের জন্য কিছু সম্পদ রেখে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল মান্নানের। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সেই স্বপ্নের প্রায় সবটুকুই হারিয়ে গেছে। মেজো ছেলের সঙ্গে যে বাড়িতে এখন আশ্রয় নিয়েছেন, সেটিও ভাঙনের কিনারায়। ইতিমধ্যে বাড়িটির দুটি ঘর ভেঙে পড়েছে।

মান্নানের মতো এমন দুর্ভোগের শিকার খোদাবক্সপুরের বহু পরিবার। স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবে, গত দুই বছরে গ্রামটিতে প্রায় ১৫০ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। চলতি বছরেই আরও ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বাড়িঘর সরিয়ে নিয়েছে। তাঁদের দাবি, অব্যাহত ভাঙনে গ্রামের প্রায় অর্ধেক এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে বহু বসতবাড়ি ও কৃষিজমি।

বসতবাড়ির উঠানেই ভাঙনের আতঙ্ক

গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অনেক জায়গায় বসতি ও ব্রহ্মপুত্রের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বলতে প্রায় কিছুই নেই। বাড়ির উঠান গিয়ে ঠেকেছে ভাঙনের কিনারায়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালা একে একে নদের দিকে হেলে পড়ছে। কোথাও বসতঘরের পাশের মাটিও ধসে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কখন নদ আরও কাছে চলে আসে, কখন পায়ের নিচের মাটি সরে যায়—এ নিয়ে তাঁদের সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়। বিশেষ করে রাতে ভাঙনের শব্দ শুনলে অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

ইতিমধ্যে কিছু পরিবার নদীর ওপারে জেগে ওঠা চরে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে নতুন করে ঘর তুললেও স্থায়ীভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা নেই। চরভূমিও নদভাঙনের ঝুঁকিতে থাকায় নতুন করে ঘর বাঁধার পর আবারও সব হারানোর আশঙ্কা তাঁদের পিছু ছাড়ছে না।

জমি-ঘর হারিয়ে নিঃস্ব মিলিক জান

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে মিলিক জানেরও। সাত বছর আগে তাঁর স্বামী মারা গেছেন। পাঁচ মাস আগে মারা গেছে এক ছেলে। স্বামী রেখে গিয়েছিলেন ২২ কাঠা জমি। সেই জমিও এখন নদে বিলীন হয়েছে।

মিলিক জান বলেন, ‘আমার সুখের সংসার আছিন। স্বামী জমিজমা থুইয়া গেছিন। কত ধান হইত, কত ফসল হইত! গোলায় ধান উঠত, বাড়িতে মানুষের আনাগোনা আছিল। জমিন নদ নিয়া গেছে। বাড়ি আছিন, ভাঙছে। গাছপালা আছিন, হেইগুলাও নদের পেটে। অহন সেই জমিন খুঁজলে নদের পানি ছাড়া আর কিছুই দেহা যায় না।’

তাঁর কথায় উঠে আসে, নদভাঙনে শুধু জমি বা ঘরবাড়িই হারায় না; হারিয়ে যায় পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি, জীবিকার অবলম্বন এবং দীর্ঘদিনের স্মৃতিও।

আশপাশের এলাকাতেও ভাঙন

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন শুধু খোদাবক্সপুরে সীমাবদ্ধ নেই। গৌরীপুরের পাশের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মরিচারচর এবং ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরদড়ি-কুষ্টিয়া ও চর শ্রীকলদীসহ কয়েকটি এলাকাতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। কোথাও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, কোথাও বসতভিটা পড়েছে ঝুঁকিতে।

ভাঙনামারী ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়লেই ভাঙন তীব্র হয়। ইতিমধ্যে গ্রামের অনেক জমি নদে চলে গেছে। আরও অনেক জমি ও বাড়িঘর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরক্ষামূলক কাজ করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর তীররক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই নতুন করে ভাঙনের শিকার হচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, ভাঙন শুরু হওয়ার পর জিও ব্যাগ বা জিও টিউব ফেলে সাময়িক প্রতিরোধের পাশাপাশি নদীর গতিপথ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ চলছে: পাউবো

ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা কমিটির সমন্বয়ক আবুল কালাম আল আজাদ বলেন, ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও নদীতীরের মানুষের নিরাপদ বসতি নিশ্চিত করা, কার্যকর তীররক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ জানান, প্রায় ২৭০ মিটার এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ চলছে।

তিনি বলেন, চরদড়ি-কুষ্টিয়ার প্রায় ৬০ মিটার অংশে জিও টিউব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। চর শ্রীকলদীতে ফেলা হচ্ছে জিও ব্যাগ। খোদাবক্সপুর ও মরিচারচরেও একই ধরনের জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ চলছে।

ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে স্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। এ জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। খোদাবক্সপুরে ব্লক দিয়ে স্থায়ী তীর সংরক্ষণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়েও অভিযোগ

নদভাঙনের পাশাপাশি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, নদ থেকে বালু তোলার কারণে কোনো কোনো স্থানে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে।

ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান জানান, গত তিন মাসে দুটি বড় অভিযানে ৪৭টি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে। এরপরও রাত ও ভোরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের চেষ্টা চলছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি মামলা করা হচ্ছে।

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে একের পর এক পরিবার যখন বসতভিটা ও জীবিকার অবলম্বন হারাচ্ছে, তখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি—জরুরি প্রতিরক্ষা কাজের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তাঁদের আশঙ্কা, কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে নদীতীরের আরও বহু পরিবারকে ঘরবাড়ি ছেড়ে অনিশ্চিত জীবনের পথে পা বাড়াতে হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন