৩৩ হাজার পূজামণ্ডপে তিন স্তরের সুরক্ষা, নিরাপদ দুর্গোৎসবের প্রত্যয় আইজিপির

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬ । ৮:০৭ অপরাহ্ণ

ধর্মীয় সম্প্রীতি অটুট রেখে শারদীয় দুর্গাপূজাকে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। প্রায় ৩৩ হাজার পূজামণ্ডপে উৎসব আয়োজনকে সামনে রেখে পূজার আগে, পূজা চলাকালীন এবং প্রতিমা বিসর্জন ও পূজা-পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধ, বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের প্রস্তুতি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশের এই উদ্যোগে স্পষ্ট—দুর্গাপূজার নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক সম্প্রীতি, জনসচেতনতা এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের নির্বিঘ্নে উৎসব উদযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করা। ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরও বলেছেন, ‘হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে পুলিশ পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।’

  • বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট প্রস্তুত
  • চালু থাকবে সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল
  • অপপ্রচার ঠেকাতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা
  • সম্প্রীতি রক্ষায় গুজব প্রতিরোধ ও জনসম্পৃক্ততায় জোর

রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের হল অব প্রাইডে শারদীয় দুর্গাপূজা ২০২৬ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সভায় সভাপতিত্বকালে তিনি এ কথা বলেন। আইজিপি বলেন, ‘দুর্গাপূজা ঘিরে পুলিশ প্রাক-পূজা, পূজা চলাকালীন এবং প্রতিমা বিসর্জন ও পূজা-পরবর্তী তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে পুলিশের পূজাকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘পূজাকে কেন্দ্র করে কোনো মহল বা গোষ্ঠী যাতে সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।’ এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি ও বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। আইজিপি দুর্গাপূজার আনন্দঘন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতি বছরের মতো এবারও দুর্গাপূজা নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হবে।

নিরাপত্তার পাশাপাশি সম্প্রীতি রক্ষায় গুরুত্ব
আইজিপির বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে—দুর্গাপূজার নিরাপত্তাকে কেবল পুলিশি পাহারা বা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। বরং উৎসবের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে সামাজিক সম্প্রীতি, জনসম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতাকে নিরাপত্তা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রায় ৩৩ হাজার পূজামণ্ডপে উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রতিটি স্থানে পুলিশের উপস্থিতি ও তদারকির পাশাপাশি স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে কমিউনিটি ও বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর আইজিপির গুরুত্বারোপ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা, পূজা উদযাপন কমিটি, ধর্মীয় নেতা এবং পুলিশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে কোনো উদ্বেগ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত অবহিত হওয়া এবং সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কার্যত নিরাপত্তার দায়িত্বকে একটি সম্মিলিত সামাজিক প্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত করতে চায় বাংলাদেশ পুলিশ। ধর্মীয় উৎসবের পরিবেশ সুরক্ষিত রাখতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং বিভ্রান্তি এড়িয়ে চলার সংস্কৃতিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তিন পর্যায়ের নিরাপত্তায় সমন্বিত প্রস্তুতি
পূজার আগে প্রস্তুতি, উৎসব চলাকালে নিরাপত্তা এবং প্রতিমা বিসর্জন ও পূজা-পরবর্তী সময়—এই তিন পর্যায়ে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। এর মাধ্যমে উৎসবের বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্য প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পুলিশি তৎপরতা পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুর্গাপূজাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পোশাকে ও সাদাপোশাকে পুলিশের পাশাপাশি সোয়াট, ক্রাইম রেসপন্স টিম (সিআরটি), কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি), ক্রাইম সিন ভ্যান ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট প্রস্তুত থাকবে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সসহ অন্যান্য পুলিশ ইউনিটে সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল চালু রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষায়িত ইউনিটের প্রস্তুতি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা
সভায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট, অপপ্রচার, গুজব কিংবা ছবি আপলোড করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং নিয়মিত পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান যোগাযোগব্যবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করতে পারে। তাই গুজব শনাক্ত করা, তথ্য যাচাই করা এবং প্রয়োজনে দ্রুত সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা উৎসবকালীন নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। আইজিপির নির্দেশনায় এই বিষয়টির অন্তর্ভুক্তি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তথ্যপ্রবাহের গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে গুজব বা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ ও আস্থা বজায় রাখাও প্রয়োজন।

পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় আয়োজকদেরও দায়িত্ব
পূজামণ্ডপে আয়োজক ও স্বেচ্ছাসেবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিরাপত্তা পরিকল্পনার বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে। সিসিটিভি সচল রাখা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং পুলিশের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ থাকলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল আচরণ উৎসবের পরিবেশকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে। এ কারণেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দের প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি সচল রাখা, পূজামণ্ডপ ও বিসর্জনস্থলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর রাখা এবং স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে সভায়। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার জন্য পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

সভায় অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন, এসআরইউর অতিরিক্ত আইজি মো. রেজাউল করিম, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, নৌ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মো. রেজাউল করিম, এসআরবির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত আইজি) মো. আহসান হাবীব পলাশ, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজি জি এম আজিজুর রহমান, অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. সায়েদুর রহমান, রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ভারপ্রাপ্ত) ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান, হাইওয়ে রেঞ্জের অতিরিক্ত আইজি ফারুক আহমেদ এবং এসবি প্রধান (অতিরিক্ত আইজি) মো. কামরুল আহসান উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন মজুমদার ও সচিব দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিও ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর ও সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রমেশ দত্ত, কল্যাণ ফ্রন্টের ট্রাস্টি ও ভাইস চেয়ারম্যান জয়দেব রায় ও যুগ্ম মহাসচিব সঞ্জয় গুপ্ত, পূজা উদযাপন ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক রূপন চন্দ্র দাস ও বিপ্লব কুমার পাল, ঢাকা মহানগর উত্তর কৃষক দল পূজা ফ্রন্টের যুগ্ম আহ্বায়ক অলোক বসু, রমনা কালী মন্দিরের সদস্য সচিব শ্রী মিঠুন কুমার দাস, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের ম্যানেজার স্বামী দেবধ্যানানন্দ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ ও সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকাস্থ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও সভায় অংশ নেন। মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার এবং নৌ পুলিশের পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ দুর্গাপূজা উপলক্ষে গৃহীত নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করে সরকার ও পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান।

কালের আলো/এমএএএমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন