আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে বন্ধ শ্রমবাজার চালু, নতুন গন্তব্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দক্ষ কর্মী তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় কয়েকটি বড় শ্রমবাজারে কর্মী গমনের গতি কমেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বিদেশে কর্মী গমন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে। এ পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার চালুর উদ্যোগের পাশাপাশি জাপানসহ নতুন গন্তব্যে কর্মী পাঠানোর সুযোগ সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারের চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
- মালয়েশিয়া-আমিরাতের শ্রমবাজার চালুর চেষ্টা
- জাপানসহ বিকল্প গন্তব্যে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা
- দক্ষতা উন্নয়ন ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে গুরুত্ব
কর্মী গমনে গতি ফেরানোই চ্যালেঞ্জ
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কর্মী গমন কমেছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন বা প্রায় ৩৩ শতাংশ।
সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে কর্মী নিয়োগ কমে আসা এ পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় অংশ কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এসব বাজারে পরিবর্তন এলে সামগ্রিক কর্মী গমনেও তার প্রভাব পড়ে। ফলে বিদ্যমান শ্রমবাজারে সুযোগ ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন গন্তব্যে প্রবেশের কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারের এক কোটি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে কর্মী প্রেরণের সক্ষমতা ও বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
মালয়েশিয়া-আমিরাত চালুর উদ্যোগে প্রত্যাশা
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মী নিয়োগ ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে বন্ধ রয়েছে। বাজারটি পুনরায় চালুর বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে। গত ২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির আশাবাদ জানায়।
তবে বাজার চালুর সময়সূচি, নিয়োগের শর্ত ও কর্মী নেওয়ার পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। এদিকে মালয়েশিয়ার ২০২৬-৩০ মেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিদেশি শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। ফলে বাজার চালু হলেও কী পরিমাণ কর্মী যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের আলোচনার অগ্রগতি ও মালয়েশিয়ার শ্রমনীতির ওপর।
অন্যদিকে, একসময় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা প্রাপ্তি সীমিত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ছুটিতে দেশে আসা কয়েক হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিলের তথ্যও সামনে এসেছে। দেশটিতে নতুন কর্মী নিয়োগের সুযোগ বাড়াতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা জোরদার এবং বিদ্যমান কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মধ্যপ্রাচ্যের চ্যালেঞ্জে বিকল্প বাজারের গুরুত্ব
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে গেছেন ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জন কর্মী। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জন। অর্থাৎ কর্মী গমন কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। কাতারে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা ৮০ হাজার ৫৭০ থেকে কমে ৪৯ হাজার ৭৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। কুয়েতেও গত বছরের প্রায় ৩৪ হাজারের তুলনায় এ বছর গেছেন প্রায় ২২ হাজার কর্মী।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিয়োগ চাহিদার পরিবর্তন এ প্রবণতায় প্রভাব ফেলেছে। তবে এসব দেশে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শ্রমসম্পর্ক ও কর্মীদের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে নতুন সুযোগ তৈরির ভিত্তি হতে পারে। পাশাপাশি নতুন দেশ ও পেশায় কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ রয়েছে।
জাপানে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর তাগিদ
বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে জাপানকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যাশা রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৫ মে জাপান সফরে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আগামী পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলেন। তবে বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাপানে গেছেন ১ হাজার ৫৬৪ জন এবং চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ১ হাজার ৬০৮ জন।
জাপানের শ্রমবাজারে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ভাষাগত দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও নিয়োগদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী প্রস্তুত করা প্রয়োজন। দেশে বিএমইটির অধীনে বর্তমানে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে আরও ৫০টি কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের মান ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে দক্ষ কর্মী তৈরির সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
দক্ষতা ও কূটনীতিতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, এক কোটি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় সক্ষমতার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বর্তমানে বাংলাদেশের রয়েছে। অন্যদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ভিপি মো. নুরুল হক বলেছেন, কর্মীদের উপযুক্ত বেতন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সরকার কাজ করছে। কয়েকটি দেশে সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাব পাঠানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অভিবাসন কূটনীতি জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করতে হবে। এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বন্ধ শ্রমবাজার চালুর প্রচেষ্টার পাশাপাশি নতুন গন্তব্যে কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের পথ আরও সুগম হতে পারে।
কালের আলো/এমএসএএকে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ